দক্ষিণ পূর্ব

একাকী ইরান: কেন পাশে নেই রাশিয়া, চীন ও আরব মিত্ররা?

মনির ফয়সাল
মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ২ মার্চ ২০২৬ ১২:২১ দুপুর
পঠিত : ৪
একাকী ইরান: কেন পাশে নেই রাশিয়া, চীন ও আরব মিত্ররা?

ছবি: সংগৃহীত

Degchibarictg

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রয়াণ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সরাসরি হামলার মুখে ইরান এখন কার্যত মিত্রহীন, একাকী। বিশ্ব রাজনীতির তিন প্রভাবশালী পক্ষ কেন তেহরানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, তার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যাবে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

 

 

রাশিয়া: কেন এই কৌশলগত দূরত্ব

 

রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের হলেও বর্তমান সংকটে মস্কো কেবল নিন্দা জানিয়েই দায় সেরেছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল, তার পরও মিত্র রাশিয়া নিন্দা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। কেন এমন চাতুরি? কেন এমন জঘণ্য কৌশল? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে।

 

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেই অনেকবার বলেছেন, ইসরায়েল একটি রুশভাষী রাষ্ট্র। কারণ সেখানে এক কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ রুশ বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করে। ইসরায়েলের সঙ্গে রাশিয়ার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সম্পর্কের গভীরতা অনেক বেশি। এই জনগোষ্ঠী আবার ইসরায়েলের নির্বাচনে একটি শক্তিশালী ভোট ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। তাদের সমর্থন ছাড়া ইসরায়েলে সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব।

 

ইসরায়েলের এই বিশাল রুশভাষী জনসংখ্যার কারণেই রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ইসরায়েলের স্বার্থের কথা মাথায় রাখে। এটিই মূলত কারণ যে রাশিয়া ইরানের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নেয় না।

 

রাশিয়া নিজেই ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত। নিজের অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক শক্তি অন্য কোনো বড় যুদ্ধে ব্যয় করার মতো বিলাসিতা এখন ক্রেমলিনের নেই।

 

এ ছাড়া রাশিয়া ভয় পায়, তাদের উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (যেমন এস-৪০০) যদি ইরানে মোতায়েন করা হয় এবং তা ইসরায়েলি প্রযুক্তির কাছে হেরে যায়, তবে বিশ্ববাজারে রুশ অস্ত্রের মর্যাদা ধুলোয় মিশে যাবে।

 

চীন: কেন এই অর্থনৈতিক সতর্কতা

 

অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্রনীতি সব সময়ই নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলে। তারা অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক চিন্তা করে। হিসাব ছাড়া সামনে পা ফেলে না চীন।

 

চীনের অর্থনীতির মূল চাকা ঘোরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের ওপর। ইরানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে যাওয়ার ঝুঁকি বেইজিং নেবে না।

 

যদিও চীন ইরানের তেলের বড় ক্রেতা, কিন্তু তারা বর্তমানে ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়ার তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে। ফলে ইরান বন্ধ হয়ে গেলেও চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে না।

 

চীন নিজেকে একজন বৈশ্বিক শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাহির করতে চায়। সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া তাদের এই ভাবমূর্তির পরিপন্থী।

 

আরববিশ্ব: কেন এই নীরবতা বা বিরোধিতা

 

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কাতারের মতো দেশগুলো কেন ইরানের পাশে নেই, তা বুঝতে হলে এই তিনটি বিষয় দেখতে হবে:

 

শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব ও আঞ্চলিক প্রভাব: শিয়া প্রধান ইরান ও সুন্নি প্রধান আরবদেশগুলোর মধ্যে দশকের পর দশক ধরে নেতৃত্বের লড়াই চলছে। আরবদেশগুলো মনে করে, ইরান তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে (যেমন ইয়েমেন বা লেবানন) হস্তক্ষেপ করছে।

 

ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক: আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে অনেক আরবদেশ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে ফেলেছে। তারা এখন ইরানকেই বরং স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি মনে করে, ইসরায়েলকে নয়।

 

মার্কিন নিরাপত্তা ছত্রছায়া: প্রায় সব আরব দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মার্কিন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে গিয়ে ইরানকে সাহায্য করা তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে।

 

ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, দেশটি যখন হিজবুল্লাহ, হুতির মতো তার প্রক্সি বাহিনীগুলোর মাধ্যমে লড়াই করে, তখন সে একা হয়ে পড়ে। রাশিয়া ও চীন ইরানকে কেবল পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু নিজেরা সেই আগুনের আঁচ গায়ে লাগাতে রাজি নয়। অন্যদিকে আরবদেশগুলো ইরানের পতনকে তাদের আঞ্চলিক ক্ষমতা সুসংহত করার একটি মওকা হিসেবে দেখছে।

 

এমএইচএফ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।