দক্ষিণ পূর্ব

ধর্মের পরিচয় নয়, রাষ্ট্রে সবার অধিকার সমান: তারেক রহমান

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৪০ রাত
পঠিত : ২৬
ধর্মের পরিচয় নয়, রাষ্ট্রে সবার অধিকার সমান: তারেক রহমান

ছবি

Degchibarictg

রাষ্ট্র একজন মুসলমান নাগরিককে যে অধিকার দেবে, অন্য ধর্মের নাগরিকদেরও একই অধিকার দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় পরিচয় নয়, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার পরিচয় এক। রাষ্ট্রের আইন ও নাগরিক অধিকার সবার জন্য সমান হতে হবে।

মঙ্গলবার রাতে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জের জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর শাখা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এটুকু বলার জন্য—এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার, এই দেশ আমাদের সবার। আমরা যেই ধর্মের হই না কেন, ধর্ম আমাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশি। যেহেতু এই দেশে আমরা জন্মেছি, এই দেশে আমরা বড় হচ্ছি, আমরা এই দেশের নাগরিক। আমাদের একমাত্র পরিচয় ধর্মের পরিচয় নয়; আমাদের একমাত্র পরিচয়, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি। সবার লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে এই বাংলাদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এই প্রিয় মাতৃভূমিকে ছিনিয়ে এনেছিল। যাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন, যাঁরা শহীদ হয়েছিলেন, সেদিন কিন্তু আমরা দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিষ্টান।’

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেসব সময়েও ছাত্র-জনতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা রাজপথে নেমে এসেছেন। তখনও আন্দোলনকারীদের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওই সময় দেশের ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারকে বিদায় করতে রাজপথে নেমেছিলেন। অনেকে গুলিতে শহীদ হয়েছেন, অনেকে আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা চিকিৎসা দেওয়ার সময় তাঁর ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাওয়া হয়নি।

তারেক রহমান বলেন, ‘স্বৈরাচার গুলি করেছে, ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে। আমার ভাই শহীদ হয়েছেন, আমার ভাই আহত হয়েছেন। বাকিরা তাঁদের ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছেন। কেউ জিজ্ঞেস করেননি, তাঁর ধর্মপরিচয় কী। ডাক্তারও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে জিজ্ঞেস করেননি, তাঁর ধর্মপরিচয় কী। তাঁর ধর্মপরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেবেন, এমন ঘটনা ঘটেনি।’

নাগরিক অধিকার ও আইনের সমতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দেশের আইন আমার জন্য যেভাবে প্রযোজ্য, এই দেশের আইন আপনার জন্যও প্রযোজ্য। এই দেশের ওপর আপনার যে অধিকার আছে, এই দেশের ওপর আমারও সেই অধিকার আছে। এই রাষ্ট্র আপনাকে যা দেবে, এই রাষ্ট্র আমাকে তা-ই দেবে।’

রাজনৈতিক কারণে দীর্ঘ ১৭ বছর বিদেশে অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের আলাদা করে দেখার মানসিকতা পরিহারের আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, ‘মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশে যদি সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু এই শব্দ দিয়ে কাউকে যাচাই-বাছাই করতে হয়, তাহলে হয়তো আমি এখানে সংখ্যাগুরু। কিন্তু আমি যখন লন্ডনে ছিলাম, আমি কি সংখ্যাগুরু ছিলাম? সেই দেশে তো অন্য ধর্মের মানুষ বেশি। আমি তো ওখানে সংখ্যালঘু ছিলাম। কাজেই সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু কোনো বিষয় নয়। বিষয় একটাই—আপনি বাংলাদেশি।’

তিনি বলেন, ১৯৭১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের মানুষের আত্মত্যাগের পেছনে মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সবাই শান্তিতে ও মিলেমিশে বসবাস করতে পারবেন। সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দল-মত ও ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের সহযোগিতা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যদি সেই বাংলাদেশ গড়তে হয়, আপনাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাদের সকলের সহযোগিতা চাই। আপনি হিন্দু হোন, আপনি মুসলমান হোন, আপনি বৌদ্ধ হোন, খ্রিষ্টান হোন, যাই হোন না কেন, আপনার সহযোগিতা আমার দরকার। কারণ, আপনার সহযোগিতা ছাড়া আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব না।’

তিনি আরও বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান ও ঐক্যের ভিত্তিতে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো তদন্ত করে প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বক্তব্যের আগে পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা প্রধানমন্ত্রীর হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক অর্পন কান্তি ব্যানার্জী। সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ।

এর আগে মঙ্গলবার সকালে রংপুর ও দুপুরে রাজশাহীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে পৌঁছে তিনি সরাসরি জেএম সেন হলের পূজামণ্ডপে যান। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময় করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্যরা।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

আরএইচ 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।