দক্ষিণ পূর্ব

দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেলেন তিন ব্যক্তি

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০১:৪১ দুপুর
সর্বশেষ আপডেট : ৪০ মিনিট আগে
পঠিত : ৯১
দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পেলেন তিন ব্যক্তি

ছবি

Degchibarictg

দুই হাত নেই, তবু থেমে থাকেননি জীবনসংগ্রামে। পায়ের আঙুলে কলম ধরে লেখাপড়া করে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। চাকরি না পেয়ে নিজেই গড়ে তুলেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নরসিংদীর সেই ব্যতিক্রমী শিক্ষক মো. আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া এবার সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুখু মিয়াসহ তিন অনুপ্রেরণাদায়ী ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্য দুজন হলেন বুয়েট থেকে পাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া নায়লা শারাফ এবং নিজ উদ্যোগে হাজার হাজার গাছ লাগানো রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য জানিয়েছেন।

সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের জীবনসংগ্রাম, ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের কথা শোনেন। তাঁদের কাজের প্রশংসা করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের অনেক প্রয়োজন। আপনাদের মতো সবাই এগিয়ে এলে দেশ গঠন সহজ হবে।’

১৯৬২ সালে নরসিংদী সদর উপজেলার নগর পাঁচদোনা এলাকায় জন্ম মো. আলতাফ হোসেনের। জন্ম থেকেই তাঁর দুই হাত নেই। সন্তানের এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার কথা ভেবে বাবা-মা তাঁর নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। তবে প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি আজ এলাকায় পরিচিত ‘শত শিশুর স্বপ্নের কারিগর’ হিসেবে।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। কিন্তু হাত না থাকায় শিক্ষাজীবনের শুরুতেই নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। তাঁর লেখাপড়ার আগ্রহ দেখে পাশে দাঁড়ান বাবা-মা। মা রান্নার পাতিলের তলা থেকে কালি সংগ্রহ করে দিতেন, আর বাবা বাঁশের কঞ্চি কেটে বানিয়ে দিতেন দোয়াত-কলম। সেই কলম পায়ের আঙুলে ধরে কলাপাতায় লেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর অক্ষরজ্ঞান।

প্রথমে বাবা তাঁকে মাদ্রাসায় ভর্তি করাতে নিয়ে গেলেও পা দিয়ে আরবি বই ধরা ও লেখার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান দুখু মিয়া। পরে গ্রামের একটি স্কুলে ভর্তি হন তিনি। সহপাঠীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় পড়াশোনা চালিয়ে যান।

পায়ের আঙুলে কলম ধরে লিখেই ১৯৮২ সালে এসএসসি, ১৯৮৪ সালে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও চাকরি পাননি দুখু মিয়া। দুই হাত না থাকায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ মেলেনি বলে জানান তিনি। সংসারের খরচ চালাতে টিউশনি শুরু করেন। কিন্তু তাতে নিজের ও পরিবারের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

একপর্যায়ে অন্যের অধীনে চাকরির আশা ছেড়ে নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৭ সালে নিজের জমানো অর্থ ও পৈতৃক জমি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। সেই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই এখন শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন তিনি।

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেড় শতাধিক। তাঁদের পাঠদানের জন্য রয়েছেন নয়জন শিক্ষক।

তবে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে আর্থিক সংকটে পড়তে হচ্ছে দুখু মিয়াকে। শিক্ষকদের বেতন দিতে অনেক সময় দুই থেকে তিন মাস দেরি হয়ে যায়। বিদ্যালয়টি অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা এবং শিক্ষকদের নিয়মিত বেতন দেওয়ার জন্য সরকারি সহায়তা চান তিনি।

দুখু মিয়া বলেন, ‘ডিগ্রি অর্জন করেও দুই হাত না থাকায় কোথাও মেলেনি সরকারি-বেসরকারি চাকরি। টিউশনি করে নিজের এবং পরিবারের চাহিদা পূরণ না হওয়ায় অধিক বেতনে চাকরি খুঁজেছি। হাত না থাকায় কেউ একজন চাকরি দেয়নি। তাই জীবন চালাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি।’

নিজের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্কুলটিতে এখন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়, চেষ্টা করছি যাতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো যায় সে ব্যবস্থা করতে। বর্তমানে স্কুলটিতে দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে এ স্কুলটি পরিচালনা করতে নয়জন শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের বেতন দিতে অনেক হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় অনেক শিক্ষককে বেতন দিতে দুই-তিন মাসও সময় লেগে যায়।’

সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে দুখু মিয়া বলেন, বিদ্যালয়টিকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের অনুমোদন দেওয়া হোক। পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন নিয়মিত পরিশোধের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

পায়ের আঙুলে কলম ধরে নিজের শিক্ষাজীবন গড়ার পর এখন শতাধিক শিশুর ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করছেন দুখু মিয়া। তাঁর এই জীবনসংগ্রাম ও উদ্যোগ শারীরিক সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। 

আরএইচ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।