ফ্রান্সে বিক্ষোভ, লুটপাট ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি সেনাসদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। একই সঙ্গে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়ও স্বীকার করেছে সরকার।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে লেকর্নু জানান, আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের দাঙ্গাপ্রবণ এলাকায় ব্যাপক পরিসরে সেনা মোতায়েন করা হবে। এ সময় বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযানও পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, গত ১৭ অক্টোবর প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁসহ বিভিন্ন শহরে দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
পার্লামেন্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ জানান, পুলিশের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীকেও কাজে লাগানো হবে। শহরের কেন্দ্রস্থলগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সমালোচনার মুখে সরকার তাদের কৌশল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ফ্রান্সের চলমান অস্থিরতাকে ‘সহিংসতা বনাম প্রজাতন্ত্রের’ লড়াই হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। এ জন্য তিনি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন। তবে এসব গোষ্ঠীর দাবি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবার মান কমে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, সরকার তা গুরুত্ব দেয়নি।
সাম্প্রতিক সহিংসতা ও তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা ফ্রান্সজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে এ পরিস্থিতি রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ার পর কিছু স্থানে কারফিউ জারি করা হয়। এতে গত রাতে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল বলে জানিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে জারি করা কারফিউ বহাল রাখা হয়। কিছু এলাকায় ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের জন্যও এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য।
পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু স্বীকার করেন, সপ্তাহান্তে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি, পুলিশের পর্যাপ্ত তৎপরতার অভাব এবং পূর্বনির্ধারিত ছুটি বাতিল না করাকে বড় ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ এসব ব্যর্থতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘যা ঘটেছে, তার জন্য আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি আমার দায়ভার স্বীকার করছি।’
অস্থিরতার কারণ অনুসন্ধানে পার্লামেন্ট একটি তদন্ত কমিশন গঠন করছে। পাশাপাশি, সড়কে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ২০০ জন গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার লিমোজেস শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলে আগুন দেওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দাঙ্গার সময় ওই অগ্নিকাণ্ডে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তি নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি তালিকায় ছিলেন এবং একটি উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীর সদস্য।
প্যারিসের রেনেসাঁ দলের আইনপ্রণেতা সিলভেইন মেইলিয়ার্ড রয়টার্সকে বলেছেন, কিছু মোবাইল অ্যাপ দাঙ্গাবাজ ও লুটপাটকারীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এসব অ্যাপ অনেকটা ওয়াকিটকির মতো ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফ্রান্সের চলমান সংকটের প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতেও। আরও অস্থিরতার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ায় দেশটির ঋণ গ্রহণের ব্যয় বেড়েছে। ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের মুনাফার হার গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সুপারমার্কেট চেইন ক্যারেফোর জানিয়েছে, চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাদের কয়েক কোটি ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, চলমান বিশৃঙ্খলার কারণে তারা নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
এদিকে, ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএনইএফ আগামী শনিবার নতুন বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থার মান ক্রমাগত কমছে এবং পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব রয়েছে। এসব দাবিতে ম্যাক্রোঁ সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ‘হলুদ ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠীও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রথম মেয়াদে পেট্রোলের ওপর কর বাড়ানোর পরিকল্পনার প্রতিবাদে ‘হলুদ ভেস্ট’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ওই সময় কয়েক মাস ধরে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ চলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে বেশ কিছু ব্যয়বহুল ছাড় দিতে হয়েছিল।
তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ফ্রান্স সরকারের পক্ষে একই ধরনের ছাড় দেওয়া কঠিন হতে পারে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।