দক্ষিণ পূর্ব

আখতারুজ্জামান বাবুর জাপানে গোপন সংসার, মিলল স্ত্রী-দুই কন্যা!

saiful
প্রকাশ : ৪ অক্টোবর ২০২৬ ১২:২৮ দুপুর
সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
পঠিত : ১২২
আখতারুজ্জামান বাবুর জাপানে গোপন সংসার, মিলল স্ত্রী-দুই কন্যা!

চট্টগ্রামের প্রয়াত শিল্পপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ব্যক্তিজীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জাপানের সরকারি নথি ও ব্যাংকিং কাগজপত্রের বরাত দিয়ে করা এক অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে এক জাপানি নারীকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। ওই সংসারে তাঁর দুই কন্যাসন্তান রয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ পাওয়া গেছে।

ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি ওয়াদার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের ২১ আগস্ট যুক্তরাজ্যে জাপানি নাগরিক মিনাকো কাওয়ারাজাকির সঙ্গে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর বিয়ে হয়। ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় জাপানি দূতাবাস থেকে দেওয়া একটি বিবাহ সনদেও এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে। সনদটি জাপানের কানাগাওয়া প্রিফেকচারের চিগাসাকি শহরের সরকারি পারিবারিক নিবন্ধনের সত্যায়িত কপির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

বাংলাদেশে প্রকাশিত বিভিন্ন জীবনীতে আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর স্ত্রী হিসেবে চট্টগ্রামের শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মেয়ে নূর নাহার জামানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তাঁদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের কথা বলা হলেও জাপানে তাঁর আরেকটি পরিবারের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

জাপানি নথিতে আখতারুজ্জামানের জন্মতারিখ ১৯৪৫ সালের ৩ মে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে প্রকাশিত জীবনীতে তাঁর জন্মতারিখ ১ মে ১৯৪৫ দেওয়া হয়েছে। ফলে জন্মতারিখ নিয়েও দুই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

নথি অনুযায়ী, আখতারুজ্জামান ও মিনাকোর বড় মেয়ে নীনা কাওয়ারাজাকি ১৯৯২ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। চলতি বছরের ৮ এপ্রিল হংকংয়ে জাপানের কনস্যুলেট-জেনারেল থেকে ইস্যু করা জন্মসনদে তাঁর বাবা হিসেবে আখতারুজ্জামান চৌধুরী এবং মা হিসেবে মিনাকো কাওয়ারাজাকির নাম রয়েছে।

মিনাকো তাঁদের দুই মেয়ের কথা নিশ্চিত করলেও সন্তানদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে রাজি হননি। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত একটি ছবিতে আখতারুজ্জামানকে মিনাকো ও দুই শিশুর সঙ্গে একটি হোটেলের বাইরে দেখা যায়। ছবিতে থাকা নারী মিনাকো কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

সম্প্রতি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের একটি নথির সূত্র ধরে জাপানি পরিবারের বিষয়টি আবার সামনে আসে। ২৩ সেপ্টেম্বর নীনা কাওয়ারাজাকি (জামান চৌধুরী) ইউসিবির গুলশান করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপকের কাছে দেওয়া চিঠিতে জানান, ২০১২ সাল থেকে তাঁর প্রয়াত বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর নামে একটি স্থায়ী আমানত রয়েছে।

চিঠিতে ওই আমানত ভেঙে দেওয়ার অনুরোধ জানান নীনা। বাংলাদেশে না থাকায় তাঁর পক্ষে অর্থ গ্রহণের জন্য মা মিনাকো কাওয়ারাজাকিকে অনুমতি দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। চিঠিতে ২৩ সেপ্টেম্বর ইউসিবির প্রাপ্তি সিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির একটি ইউসিবি স্থায়ী আমানতের রসিদেও আখতারুজ্জামান ও নীনার নাম রয়েছে। ওই আমানতের পরিমাণ ছিল ১ কোটি টাকা। তিন মাস মেয়াদি আমানতের বার্ষিক সুদের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালের ওই রসিদে থাকা হিসাব নম্বরটি নীনার ২০২৬ সালের আবেদনে উল্লেখ করা হিসাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে আমানতটি বর্তমানে কী অবস্থায় আছে, পরে তা নবায়ন করা হয়েছিল কি না কিংবা নীনার আবেদনের বিষয়ে ব্যাংক কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

মিনাকো জানান, বাংলাদেশে আখতারুজ্জামানের আরেকটি পরিবার থাকার বিষয়টি তিনি পরে জানতে পারেন। তবে দুই পরিবারের জীবন কখনো একসঙ্গে হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তাঁদের পরিচয় ও বিয়ের পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত বলতে রাজি হননি মিনাকো।

আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইউসিবির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে ব্যাংকটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় বিতর্ক ও আইনি অভিযোগও ওঠে। ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক তাঁকে ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়।

১৯৯৩ সালের এপ্রিলে ইউসিবির পরিচালক হুমায়ুন জহির ঢাকার ধানমন্ডিতে নিজ বাসায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ঘটনায় করা মামলায় আখতারুজ্জামানসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তির বিষয়টি প্রতিবেদনে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

১৯৯৯ সালে ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদের একটি সভায় আখতারুজ্জামানের পরিবারের সদস্য ও সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলার অভিযোগ ওঠে। পরিচালকদের পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পর্ষদ ভেঙে দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে ২০১০ সালে তিনি আবার ইউসিবির পরিচালনা পর্ষদে ফিরে আসেন।

২০১২ সালের ৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে মারা যান আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে করা স্থায়ী আমানতের কাগজে নীনার নাম থাকার বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

আখতারুজ্জামানের ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি চট্টগ্রামের একটি আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং পরে ভূমিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

সাইফুজ্জামানের বিদেশি সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনুসন্ধান হয়েছে। ২০২৪ সালে আল জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যসহ বিদেশে তাঁর সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে সাইফুজ্জামান দাবি করেন, এসব সম্পত্তি বৈধ বিদেশি ব্যবসা থেকে অর্জিত অর্থে কেনা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একটি আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পর সাইফুজ্জামানের যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি সম্পত্তি জব্দের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, এসব সম্পত্তির মূল্য প্রায় ২৭ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ পাউন্ড। 

অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্তের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তবে অভিযোগগুলোর এখনো বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।

মিনাকোর দাবি, আখতারুজ্জামানের বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে তাঁর কখনো দেখা হয়নি এবং তাঁর দুই মেয়ের সঙ্গেও ওই পরিবারের কারও যোগাযোগ ছিল না। জাপানি পরিবারটি সাইফুজ্জামানের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছিল বলে কিছু সূত্র দাবি করলেও মিনাকো তা সরাসরি অস্বীকার করেছেন।

আখতারুজ্জামানের মৃত্যুর খবরও পরিবারের কাছ থেকে নয়, সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারেন বলে জানান মিনাকো। তাঁর দুই মেয়ে বাবার সম্পত্তির কোনো অংশ পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা কিছু পাননি। তবে এর কারণ বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি।

নীনার সাম্প্রতিক ইউসিবি যোগাযোগের উদ্দেশ্য এবং স্থায়ী আমানতের বর্তমান অবস্থা নিয়েও মিনাকো কোনো মন্তব্য করেননি। একইভাবে নীনার আবেদনের বিষয়ে ইউসিবি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।   সূত্র : ডেইলি ওয়াদা

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।