দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২৩ কনটেইনারে বিপজ্জনক রাসায়নিক, ৪৪টি জরাজীর্ণ

saiful
saiful
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২০ দুপুর
পঠিত : ২২
চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২৩ কনটেইনারে বিপজ্জনক রাসায়নিক, ৪৪টি জরাজীর্ণ
Degchibarictg




চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর পড়ে আছে বিপজ্জনক রাসায়নিকভর্তি ৩২৩ টিইইউ কনটেইনার। এর মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কয়েকটি কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসছে। এতে অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দ্রুত এসব রাসায়নিক নিরাপদে অপসারণ ও নিষ্পত্তি করা না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ড ও জেটিতে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কয়েকটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। এগুলোর মধ্যে অ্যাসিড, মিথানল ও থিনারের মতো রাসায়নিক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তির অভাবে কনটেইনারগুলোর কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়া কিংবা আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ছে।


২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক জমে থাকার ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, এসব রাসায়নিক উচ্চ অগ্নিঝুঁকিসম্পন্ন। স্বাভাবিকভাবেই এগুলো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।


বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম রনি বলেন, যেকোনো মুহূর্তে এসব রাসায়নিকের কনটেইনারে বিস্ফোরণ বা আগুন লাগতে পারে। আগুন ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে। বন্দরে রাসায়নিকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্য থাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক হতে পারে।


 কেন পড়ে আছে রাসায়নিক

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানিকারকেরা পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বছরের পর বছর এসব রাসায়নিক বন্দরে পড়ে আছে। আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না হওয়ায় নিলামে বিক্রির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।


তবে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্যের মতো নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে এগুলোর ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে।


কিছু রাসায়নিক ধ্বংসের উদ্যোগ

বন্দরে জমে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণে সম্প্রতি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনারের রাসায়নিক নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক ছিল। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরীক্ষামূলকভাবে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। তবে বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক নিরাপদে নিষ্পত্তি করতে আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন।


এদিকে রাসায়নিক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি কাভার্ড ভ্যানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় আগুন লাগার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল। প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।


 দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ

জরাজীর্ণ কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক নিলামে বিক্রি না করে বন্দরে ফেলে রাখায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।


চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে নিলামপ্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।


সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যেসব রাসায়নিক ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রি করা যেতে পারে। অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী কিংবা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপযুক্ত স্থাপনায় নিরাপদে ধ্বংস করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জননিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।


চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য বন্দর থেকে সরিয়ে নিতে নিয়মিত কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে।


পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।


বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে এলে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।


দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এখন শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। তাই ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনার শনাক্ত করে রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ এবং নিরাপদ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।



মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।