রিপোর্ট হাতে আসার পর একটা পরিবারে প্রথম যে প্রশ্নটা ওঠে, তা প্রায়ই রোগ নিয়ে নয়, জায়গা নিয়ে। “ভারত যাবে, নাকি সিঙ্গাপুর?” কেউ থাইল্যান্ডের হাসপাতালের নাম বলেন, কেউ পরিচিত কারও অভিজ্ঞতা শোনান। ধীরে ধীরে একটা ধারণা শক্ত হয়ে বসে: দেশের বাইরে গেলেই চিকিৎসা ভালো হবে।
কিন্তু প্রশ্নটা হলো, প্রতিবারই কি সত্যিই বিদেশে যেতে হয়?
আমার মনে হয়, এই প্রশ্ন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
সংখ্যাটা ছোট নয়
বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া এখন আর কয়েকটি পরিবারের বিষয় নয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসাবে, প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। অথচ স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে এর কোনো আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই। ঢাকা চেম্বারের এক সেমিনারে বলা হয়েছে, বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিতে বাংলাদেশিদের বছরে খরচ হয় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি।
এই বিপুল অর্থের পুরোটাই আসে মানুষের নিজের পকেট থেকে। এমনিতেই দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ রোগীকে নিজেকে বহন করতে হয়। সর্বশেষ জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৮.৫ শতাংশই মিটিয়েছেন রোগী ও তাঁদের পরিবার। বিদেশযাত্রা সেই বোঝাকে আরও ভারী করে।
দেশের স্বাস্থ্যসেবা আগের জায়গায় নেই
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা দুই দশক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, উন্নত প্রযুক্তি এবং জটিল রোগের চিকিৎসায় অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সুযোগ বেড়েছে। তাই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জানা জরুরি, নিজের রোগের জন্য দেশে কী ধরনের চিকিৎসা ও বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
“বিদেশে চিকিৎসা মানেই ভালো চিকিৎসা”, শুধু এই ধারণার ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। একজন রোগীর জন্য কোন চিকিৎসা উপযুক্ত, তা নির্ভর করে রোগের ধরন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, চিকিৎসকের দক্ষতা, হাসপাতালের সক্ষমতা এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর।
অন্যের গল্প, নিজের রোগ
আমার অভিজ্ঞতায়, অনেক সময় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয় পর্যাপ্ত তথ্য যাচাই না করেই। আত্মীয়ের পরামর্শ, পরিচিত কারও অভিজ্ঞতা, কিংবা ফেসবুকে পড়া কোনো গল্প থেকেও এমন সিদ্ধান্ত আসে। কিন্তু একজন রোগীর চিকিৎসা আরেকজনের মতো নয়। একই নামের রোগ দুজন মানুষের শরীরে দুইভাবে আচরণ করতে পারে। তাই অন্যের অভিজ্ঞতা শোনার আগে চিকিৎসকের কথা শোনা দরকার।
এখানেই দ্বিতীয় মতামতের গুরুত্ব। জটিল রোগে প্রয়োজনে একাধিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া যায়। দেশে চিকিৎসার সুযোগ কোথায় আছে, ঠিক কী চিকিৎসা দরকার, আর বিদেশে যাওয়ার সত্যিই কোনো বাড়তি চিকিৎসাগত প্রয়োজন আছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর আগে জানা উচিত।
হাসপাতালের বিলের বাইরেও খরচ
বিদেশে চিকিৎসার হিসাব কেবল হাসপাতালের বিলে শেষ হয় না। যাতায়াত, থাকা, খাওয়া, ভিসা, সঙ্গে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের খরচ, আর দেশে ফিরে ফলোআপ, সব মিলিয়েই আসল হিসাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশবিষয়ক এক প্রতিবেদনে ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেখা যায়, বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া একজন রোগীর গড় নিজস্ব ব্যয় ছিল ২ লাখ ২০ হাজার ৫৯৩ টাকা।
কিছু রোগে এই ফারাক আরও বড়। বাংলাদেশের ক্যানসার রোগীদের নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের বছরে নিজস্ব ব্যয় ছিল গড়ে ১৫ হাজার ১৮৩ মার্কিন ডলার, যা দেশে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের দ্বিগুণেরও বেশি।
তবে বিষয়টা শুধু টাকার নয়। বিদেশে গেলে রোগীকে মানিয়ে নিতে হয় নতুন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে, অচেনা যোগাযোগরীতি, অনেক সময় ভিন্ন ভাষা আর পরিবেশের সঙ্গে। অসুস্থ শরীরে এই মানিয়ে নেওয়াটাও কম ধকল নয়। আর চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরে নিয়মিত ফলোআপ কীভাবে হবে, সেই প্রশ্নও থেকে যায়।
উল্টো দিকে, দেশে চিকিৎসা নিলে রোগী থাকেন নিজের পরিবারের কাছে, চেনা পরিবেশে। পরে পরীক্ষা, ফলোআপ আর পরবর্তী সেবা নেওয়াও সহজ হতে পারে। অসুখের দিনে প্রিয়জনের পাশে থাকা নিজেই এক ধরনের ওষুধ।
অবশ্যই সব রোগীর পরিস্থিতি এক নয়। কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসা বা নির্দিষ্ট পদ্ধতির জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হতেই পারে। তাই আমার কাছে মূল প্রশ্ন বিদেশে যাওয়া বা না যাওয়া নয়। মূল প্রশ্ন হলো: সঠিক রোগের জন্য সঠিক জায়গায় সঠিক চিকিৎসা।
দুই দিকের অতিরঞ্জনই ভুল
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উন্নতির অনেক জায়গা আছে। সব ধরনের চিকিৎসা বাংলাদেশেই পাওয়া যায়, এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। আবার দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা মোটেই যথেষ্ট নয়, এই ধারণাও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। দরকার তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন।
দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপর মানুষের আস্থা বাড়াতে হলে ভালো চিকিৎসার পাশাপাশি দরকার স্বচ্ছ তথ্য, রোগীর সঙ্গে পরিষ্কার যোগাযোগ, আর চিকিৎসার ফলাফল নিয়ে দায়িত্বশীল কথা বলা। আস্থা তৈরি হয় কথায় নয়, অভিজ্ঞতায়। একজন রোগী যখন সম্মান পান, প্রশ্নের উত্তর পান, তখনই তিনি অন্যকে বলেন, “দেশেই ভালো চিকিৎসা পেয়েছি।”
তিনটি প্রশ্ন
আমি বিশ্বাস করি, বিদেশে যাওয়ার আগে প্রত্যেক রোগী ও পরিবারের অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর জানা উচিত:
১. আমার রোগের জন্য ঠিক কী চিকিৎসা প্রয়োজন?
২. সেই চিকিৎসা বাংলাদেশে কোথায় পাওয়া যাচ্ছে?
৩. আমার ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার সত্যিই কোনো বাড়তি চিকিৎসাগত প্রয়োজন আছে কি?
বিদেশে যাওয়া নিজে ভালো বা খারাপ সিদ্ধান্ত নয়। ভালো সিদ্ধান্ত হলো রোগীর প্রয়োজন বুঝে, তথ্য যাচাই করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সঠিক জায়গায় চিকিৎসা নেওয়া।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় চ্যালেঞ্জ এখনো অনেক। কিন্তু একই সঙ্গে সক্ষমতাও গড়ে উঠছে। তাই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত হোক ধারণায় নয়, তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শ আর প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে।
পাসপোর্ট হাতে নেওয়ার আগে তাই একবার থামুন। নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: যে চিকিৎসা খুঁজছি, তা কি আমার দেশেই আছে?
লেখক: মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন মামুন
হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।