দক্ষিণ পূর্ব

জ্বালানির দাম বাড়তেই চড়া চালের বাজার, কেজিতে বাড়তি ৩ টাকা

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:০৬ বিকাল
পঠিত : ৩২
জ্বালানির দাম বাড়তেই চড়া চালের বাজার, কেজিতে বাড়তি ৩ টাকা

ছবি

Degchibarictg

 জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এবার তার প্রভাব পড়েছে চালের বাজারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও ধানের বাড়তি দামকে কারণ দেখিয়ে রাজধানীর পাইকারি ও খুচরা বাজারে প্রায় সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত এক থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে ১ থেকে ৩ টাকা। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন সাধারণ ভোক্তারা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় দেশের বিভিন্ন মোকাম থেকে চাল পরিবহনে ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ধানের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দাম বাড়াচ্ছেন। বাজার তদারকির ঘাটতিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন তারা।

গত ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এর প্রায় ১১ দিন পর রাজধানীর বাজারে নতুন দামে চাল বিক্রি শুরু হয়। শুক্রবার রাজধানীর কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, বাবুবাজার ও নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, সরু চালের মধ্যে মিনিকেট ও নাজিরশাইলের দাম মানভেদে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে ৬৮ থেকে ৭৫ টাকায় উঠেছে। কিছু ব্র্যান্ডের সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৭৬ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে। মাঝারি মানের বিআর-২৮, ব্রি-২৯ ও পাইজাম চালের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায়। এসব চালের দাম কেজিতে বেড়েছে ১ থেকে ৩ টাকা। অন্যদিকে মোটা চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে এ চাল বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে বেশি দামে বিক্রি হওয়া পোলাও চালের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। মানভেদে খোলা পোলাও চালের কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে এ ধরনের চালের দাম ছিল ২০০ থেকে ২১০ টাকা।

পাইকারি ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও কুষ্টিয়া থেকে চাল পরিবহনের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি কুষ্টিয়ার খাজানগর ও নওগাঁর মোকামে ধানের বস্তাপ্রতি দাম ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মিলগেট পর্যায়েও চালের দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বেঙ্গল অটো রাইস মিলের এক বিক্রয়কর্মী জানান, ডিজেলের দাম বাড়ার পর দিনাজপুর থেকে চাল আনতে ট্রাকপ্রতি প্রায় ৩ হাজার টাকা এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আনতে প্রায় ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে। অন্যান্য খরচও বেড়েছে। ফলে প্রতি কেজি চালের পাইকারি দাম ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা পর্যন্ত বাড়াতে হচ্ছে।

কাওরান বাজারের বাহার ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী ফারুক জানান, দুই দিনের ব্যবধানে চালের দাম কেজিতে ২ টাকা বেড়েছে। তবে পোলাও চালের দাম কমেছে।

আরেক বিক্রয়কর্মী মহিউদ্দিন বলেন, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট থেকে ৩০ বস্তা চাল আনতে গত সপ্তাহের তুলনায় বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। এতে পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি খরচ বেড়েছে প্রায় ১ টাকা।

পাইকারি বাজারে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চালের দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে কিছু এলাকার খুচরা বিক্রেতা পুরোনো মজুত থেকে সীমিত লাভে চাল বিক্রি করছেন। ক্রেতা হারানোর আশঙ্কায় তারা এখনই পুরো বাড়তি খরচ বিক্রয়মূল্যে যোগ করছেন না। যাত্রাবাড়ীর কয়েকজন আড়তদার ও বিক্রেতার আশঙ্কা, পুরোনো মজুত শেষ হলে খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে চালের চাহিদা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ঢাকা মহানগরের দৈনিক বাজারদরের তথ্যেও মাঝারি মানের চালের দাম বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দাম বর্তমানে কেজিপ্রতি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব চালের দাম কেজিতে প্রায় ৩ টাকা বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকার মধ্যে অপরিবর্তিত রয়েছে।

চালের দাম বাড়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। অথচ সীমিত আয়ের মানুষের উপার্জন বাড়ছে না। ফলে সংসারের ব্যয় সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

১০ কেজি বিআর-২৮ চাল কিনতে গিয়ে বাড়তি দাম চাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানান গৃহকর্মী তাসনিম আরা । তিনি বলেন, দোকানদার কেজিপ্রতি ৬৫ টাকা চাইলেও দরদাম করে ৬৪ টাকা দরে চাল কিনেছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা একের পর এক সব জিনিসের দাম বাড়াচ্ছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানোর খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না।

চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে তদারকি ও অভিযান জোরদার করা হবে।

অধিদপ্তরের পরিচালক আতিয়া সুলতানা বলেন, সারা দেশের বাজারে প্রতিদিন কর্মকর্তারা তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। নতুন করে চালের দাম বাড়ার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় অভিযান জোরদার করা হবে।

অন্যদিকে কুষ্টিয়ার এক অটো রাইস মিল মালিক বলেন, ধানের দাম, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও পরিবহনসহ চাল উৎপাদনের বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। এসব খরচ বাড়লে আগের দামে চাল সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় মিলগেট পর্যায়ে দাম সমন্বয় করতে হচ্ছে।

চালের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের খাদ্যব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাই পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব যাচাইয়ের পাশাপাশি বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর তদারকির দাবি জানিয়েছেন ভোক্তারা।

আর/ দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।