দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, সাধারণ মানুষের জন্য প্রযুক্তি ও আর্থিক সেবা সহজলভ্য করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
আর্থিক লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও সবার জন্য সহজলভ্য করার লক্ষ্যে ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম ‘জিপে’ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। ‘জিপেতেই সমাধান’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটির উদ্বোধন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। বিশেষ অতিথি ছিলেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান স্বাগত বক্তব্য দেন। পরে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ও সমাধান সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা দলের উপস্থিতিতে জিপে-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়।
অনুষ্ঠানে জিপে’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. আহমদ আরমান সিদ্দিকী প্ল্যাটফর্মটির বিভিন্ন সুবিধা ও ফিচার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো সকলের জন্য লেনদেনের জটিলতা কমিয়ে লেনদেনকে সহজবোধ্য করে তোলা। আর্থিক যেকোনো জটিলতায় “জিপেতেই সমাধান” এনে দেওয়াই আমাদের মূল প্রতিশ্রুতি।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের লেনদেনকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের শুরুর দিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন যাত্রা শুরু করি তখন বিদ্যুৎ ছিল না। এমন একটা অবস্থায় কানেক্টিভিটি নিয়ে আমাদের বিপদে পড়তে হতো। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ, এক ব্রাঞ্চের সঙ্গে অন্য ব্রাঞ্চের যোগাযোগ নিয়ে সমস্যা হতো। সেই জায়গা থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যরা এখন মোবাইলেই সব কাজ করতে পারবেন। এটার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।’
গ্রামীণফোনের শুরুর সময়ের কথাও স্মরণ করেন প্রফেসর ইউনূস। তিনি বলেন, গ্রামীণফোনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামের দরিদ্র মানুষের কাছে মোবাইল ফোন পৌঁছে দেওয়া। সে সময় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, গ্রামের নারীরা মোবাইল ফোন দিয়ে কী করবেন। তবে পরে প্রমাণ হয়েছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামের নারীরাও আয়-উপার্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘গ্রামীণফোনের একটা লক্ষ্য ছিল যে গরিব মানুষের কাছে, গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছানো। তাদের লক্ষ্য ছিল যে এটা প্রথম যাবে গ্রামের গরিব নারীদের কাছে। তখন মানুষ বলল, ফোন তো দরকার শহরের মানুষের, ব্যবসায়ীদের। গ্রামের মহিলা ফোন দিয়ে কী করবে? সে তো নম্বরই চেনে না। আমি বহুবার ব্যাখ্যা করেছি যে পৃথিবীতে নম্বর দশটাই। এটা শিখে নেওয়া যাবে এবং তারা ফোন থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় কথা বলতে পারবে, দূরে থাকা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে অন্য মানুষকে আলাপ করিয়ে দিয়ে আয়-উপার্জন করতে পারবে।’
গ্রামীণফোনকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণে বিভিন্ন ব্যবসা সম্প্রসারণের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সারাবিশ্বে তখন “বিগ সিটি বিগ বিজনেস” হচ্ছে সেলুলার ফোন দিয়ে। তারা বলল, আমাদেরটা ব্যবসা না, তাদেরটাই ব্যবসা। অথচ আমরা প্রমাণ করলাম যে আমাদেরটাই ব্যবসা। গ্রামীণফোনকে কেন্দ্র করে বহু কোম্পানি শহরের বাইরে তাদের ব্যবসাকে নিয়ে গেল, গ্রামের গরিব মানুষের হাত দিয়েই তাদের ব্যবসা গড়ে তুলল।’
‘জিপে’র লক্ষ্য সম্পর্কে প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘মানুষকে ভয় থেকে মুক্তি দেওয়া। এখন আর টাকা বহন করতে হবে না। এটা এক বড় পরিত্রাণ। নোট নিয়ে, কাগজ নিয়ে আমাদের আর চিন্তা নেই। সাধারণ মানুষের কাছে যে সার্ভিস নিয়ে যেতে পারব সেখানেই সাফল্য। এটাই আমাদের প্রচেষ্টা।’
তিনি আরও বলেন, ‘বড়লোকের বহু আয়োজন থাকে, কিন্তু গরিবের নেই। গরিবের জন্য যেন প্রযুক্তি থাকে, সার্ভিস থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রযুক্তি ও সেবা পৌঁছে দিতে হবে।’
গ্রামীণের সবকটি ব্যবসাই সামাজিক ব্যবসা উল্লেখ করে প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘সামাজিক ব্যবসার লক্ষ্য হলো সমস্যার সমাধান করা। জিপে একটি সামাজিক ব্যবসা। এখানে মুনাফা কোনো ব্যক্তি নেবে না। কোম্পানি যা লাভ করবে তা দিয়ে সম্প্রসারণ করবে। সামাজিক ব্যবসার মধ্যেই তা সম্প্রসারিত হবে।’
গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। সেটি হলো তিন শূন্যের পৃথিবী গড়ার কাজে নিয়োজিত হওয়া।
অনুষ্ঠানের শেষে গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতাদের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টাকা পে’ কার্ড তুলে দেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
আর/ দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।