নাটোরের গুরুদাসপুরে এসএসসি পরীক্ষার্থী এক স্কুলছাত্রীকে বিদ্যালয় থেকে অপহরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণের মামলায় যাবজ্জীবন ও ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও বিএনপির সাবেক নেতা ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর সমর্থকদের নিয়ে এলাকায় সভা করে বাদীপক্ষকে উদ্দেশ্য করে হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তির পর ফিরোজুল ইসলামকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তাঁর অনুসারীরা। পরে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর এলাকায় কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে একটি সভায় বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ফিরোজকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে আমাকে সাজা দিল। দুর্নীতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে আপনাদের ধারণা আছে? আমার বিরুদ্ধে মামলা দিল। চারজনের সাক্ষীতে যদি আমাকে যাবজ্জীবন জেল দেয়, তাহলে এখানে কয়েক হাজার লোক আছে এরা তো সবাই সাক্ষী দিচ্ছে প্রতিপক্ষরা কী করেছে। বিচার হবে। বিচার কিন্তু শুরু হয়েছে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি এই নাজিরপুরের মাটিতেই বিচার হবে।’
তবে তিনি কাকে উদ্দেশ্য করে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, তা স্পষ্ট করেননি।
মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী ছাত্রীর বাবা অভিযোগ করে বলেন, জামিনে মুক্তির পর ফিরোজুল ইসলাম তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। নাজিরপুরের মাটিতেই ‘বিচার’ করার হুমকি দেওয়ায় তিনি ও তাঁর পরিবার আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। বিষয়টি থানায় জানানো হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ফিরোজুল ইসলাম ফিরোজ গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি নাজিরপুরের দৌলতপুর গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে এবং গুরুদাসপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি।
মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ে আসা ১৫ বছর বয়সী ওই ছাত্রীকে বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে থেকে জোর করে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যান ফিরোজ। পরে রাজশাহীর একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে তাকে আটকে রেখে ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। ঘটনার পর ভুক্তভোগীর বাবা বাদী হয়ে ফিরোজ ও তাঁর দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে গুরুদাসপুর থানায় মামলা করেন।
পরে ১১ অক্টোবর রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার তকীতলার একটি আবাসিক হোটেল থেকে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন র্যাব-৫।
মামলার বিচার শেষে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মলহিদুজ্জামান মুহিত ফিরোজুল ইসলামকে ধর্ষণের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপহরণের ধারায় ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুন্সি আবুল কালাম আজাদ জানান, পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং মামলায় উপস্থাপিত ভিডিওর ভিত্তিতে ফিরোজের বিরুদ্ধে দুটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত পৃথক দুই ধারায় সাজা দেন।
ভুক্তভোগীর বাবা বলেন, মামলা দায়েরের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আসামিপক্ষের লোকজন তাঁদের হুমকি দিয়েছে এবং আপসের জন্য অর্থের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। তবে মেয়ের সম্মানের কথা বিবেচনা করে তাঁরা মামলা চালিয়ে যান। আদালতের রায়ে তাঁরা সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু প্রায় ১১ মাস কারাভোগের পর ফিরোজ জামিনে মুক্ত হয়ে ফের হুমকি দেওয়ায় তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাজশাহী কারাগারের সামনে দুই শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে ফিরোজের সমর্থকেরা উপস্থিত হন। পরে ফুলের মালা দিয়ে তাঁকে বরণ করে নাজিরপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সমর্থকদের উপস্থিতিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্য এবং বাদীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ফিরোজুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হান্নান বলেন, ধর্ষণ মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আর/ দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।