দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক
ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর কক্ষে অনুষ্ঠিত দেওবন্দি ধারার সাতটি ইসলামী দলের ঐক্যবদ্ধ পথচলার বৈঠক ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বৈঠককে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া নানা তথ্যের বিপরীতে মূল ঘটনার বিবরণ ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন বাবুনগর মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস শাইখ হারুন আজিজী। বৈঠকে উপস্থিত এই হেফাজত নেতা সম্ভাব্য জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।হারুন আজিজির ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
মুরুব্বীদের ইখলাস ও তরুণ নেতৃত্বের ঔদ্ধত্য
বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগেই আমীরে হেফাজত আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী মনপ্রাণ উজাড় করে চেষ্টা করেছিলেন যেন দেওবন্দী ধারার ইসলামী দলগুলোর মাঝে একটি টেকসই ও মজবুত ঐক্য গড়ে ওঠে। যাতে দিকভ্রান্ত জাতি দিশা পায়। কিন্তু তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন দলের অজুহাতে সেই কাঙ্ক্ষিত ঐক্য সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পুনারম্ভ হওয়া ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মনগড়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে এবং বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বীদের কটাক্ষ করে একশ্রেণীর আবেগী তরুণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এছাড়া দ্বীনী বৈঠকের গোপন বিষয়াশয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
এমপির আসন গ্রহণ বিতর্ক ও আসল ঘটনা
বৈঠকে বিকেএমের (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) একজন নবনির্বাচিত এমপির সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ সত্যবর্জিত। তিনি বৈঠক শুরু হওয়ার পর আমীরে হেফাজতের কক্ষে প্রবেশ করলে জ্যেষ্ঠ মুরুব্বীরা তাকে সম্মান জানিয়ে সামনের সারিতে বসিয়ে দেন। মূলত তার নিজ দলের দায়িত্বশীলরাই তাকে আমীরে হেফাজত বা আয়োজকদের কাছে এমপি হিসেবে সঠিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেননি। ফলে ঘটে যাওয়া বিভ্রান্তির পুরো দায়ভার ওই দলের নেতৃবৃন্দের ওপরই বর্তায়।
ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও কালক্ষেপণের কৌশল
পূর্বসিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি দল থেকে পাঁচজন ক্ষমতাসম্পন্ন দায়িত্বশীল উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও কয়েকটি দল এর ব্যত্যয় ঘটায়। তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার না রেখে কেবল ‘কার্যনির্বাহী বা শূরা কমিটির’ অজুহাত তুলে কালক্ষেপণ করে। কোটি হেফাজত কর্মীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নকে এভাবে জিম্মাদারদের স্বেচ্ছাচারিতায় ভেস্তে দেওয়ার উপক্রম করা হচ্ছে।
এক দলের মহাসচিবের অহমিকা, ঔদ্ধত্য ও মুরুব্বীদের প্রতি চরম অশ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ পুরো পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে। অন্যদিকে কয়েকটি দল হেফাজতের অধীনে ঐক্যবদ্ধ পথচলার ব্যাপারে আন্তরিকতা দেখালেও, সাহাবা-বিদ্বেষী গোষ্ঠীর জোটভুক্ত দুটি দল কোনো আগ্রহ দেখায়নি। তাদের আচরণে মনে হয়েছে, তারা কেবল জাতির ধিক্কার থেকে বাঁচতেই কালক্ষেপণের উদ্দেশ্যে বৈঠকে যোগ দিয়েছিল।
ফ্যাসিবাদ ট্যাগ ও বিতর্কিত প্রস্তাব
হেফাজতের পক্ষ থেকে পেশ করা লিখিত ঐক্য ফর্মুলায় জমিয়ত মহাসচিব আফেন্দি সাহেব প্রস্তাব দেন—সব ক্ষেত্রে শূরার অনুমোদনের সময় নাও পাওয়া যেতে পারে, তাই আমীরে হেফাজতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত গণ্য হবে। এ কথা শুনে বিকেএমের এক দায়িত্বশীল নিচু স্বরে এটিকে ‘ফ্যাসিবাদ’ বলে মন্তব্য করেন। আবার উক্ত নেতাই লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সময় প্রস্তাব করেন, প্রতিটি দল থেকে ৩ জন সদস্য থাকলেও হেফাজতের পক্ষ থেকে কেবল মহাসচিব থাকতে পারবেন। মুরুব্বীদের প্রতি এমন নিকৃষ্ট মনস্তাত্ত্বিক মানসিকতা বৈঠকে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। তবে পুরো বৈঠকে মুফতী সাখাওয়াত হোসাইন রাজিকে যথেষ্ট আন্তরিক ও মুরুব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল দেখা গেছে।
নেতৃত্বের অহংকার ও আদর্শিক ষড়যন্ত্র
বৈঠকে তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে মুরুব্বীদের সোহবতে বা নেগরানিতে থেকে কাজ করার সদিচ্ছার চরম অভাব পরিলক্ষিত হয়। তাদের মানসিকতা এমন ছিল যেন মুরুব্বীরা তাদের ছায়াতলে থাকবে এবং তারা মুরুব্বীদের নিয়ন্ত্রণ করবে। খেলাফত মজলিসের এক নায়েবে আমীর প্রবীণ আমীরে হেফাজতকে বাদ দেওয়ার সূক্ষ্ম ইঙ্গিত পর্যন্ত প্রদান করেন। দেওবন্দী ধারায় রাজনৈতিক ঐক্যের পথ রুদ্ধ করতে একটি বিশেষ চক্র কৌশলে দলগুলোকে প্রভাবিত করছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
আমীরে হেফাজতের আবেগঘন বার্তা ও পরিস্থিতির মোড় ঘুরানো
রাজনৈতিক নেতাদের এই ধরণের আচরণ দেখে আমীরে হেফাজত আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, আল্লামা মুফতী খলীল আহমদ কুরাইশী, মুফতী জসিম উদ্দিন ও মাওলানা সালাহ উদ্দিন নানুপুরী অত্যন্ত বেদনাহত ও অসন্তুষ্ট হন।একপর্যায়ে আল্লামা সালাহ উদ্দিন নানুপুরী আমীরে হেফাজতের পক্ষে আবেগঘন বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, "আমার নানা (আমীরে হেফাজত) বলছেন, আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কোনো দরকার নাই। আমরা এখন কবরযাত্রী। আপনারা সব রাজনৈতিক দল নেতৃত্বগুণে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারলে আমাদের কোনো আপত্তি নাই, বরং আমরা খুশি। কিন্তু পুরো জাতি আজ বাবুনগরের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাতে সবাই অধীর আগ্রহী। আপনারা ব্যর্থ হলে জাতি সবাইকে ধিক্কার দিবে।"
আমীরে হেফাজতের এই পরম ইখলাসপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য বৈঠকের থমথমে পরিবেশকে নিমিষেই শীতল করে দেয়। উপস্থিত সবাই শান্ত হন এবং নতুন উদ্যমে ঐক্যের পথ তরান্বিত করার প্রেরণা পান।'
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।