দক্ষিণ পূর্ব

বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৭ সকাল
পঠিত : ৩৬
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ছবি

Degchibarictg

অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বাংলাদেশ অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, বর্তমানে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে না। অপরাধে জড়িত ব্যক্তি কিংবা দায়িত্বে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদেরও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে (ডিডব্লিউ) বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পুলিশ বাহিনীর সংস্কার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সীমান্ত পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর গত সাত-আট মাসে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক গুম কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। এ ধরনের কোনো অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

নিজে অতীতে রাজনৈতিক নিপীড়ন ও গুমের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সে সময় তিনি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। ভবিষ্যতে যেন কাউকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হতে না হয়, সেটিই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, অতীতের তুলনায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এতে অপরাধের প্রবণতাও কমেছে।

পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, গত বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দেশে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬১৯টি। একই সময়ে বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৮২টিতে। তাঁর দাবি, এতে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি কমেছে। একইভাবে দাঙ্গা ও সংঘবদ্ধ জনতার সহিংসতার ঘটনা ৫৪টি থেকে কমে ১৬টিতে নেমে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, এখন মানুষ অপরাধের শিকার হলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই থানায় গিয়ে মামলা করতে পারছেন। পুলিশও অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রতিষ্ঠান সংস্কার শুধু কাগজে-কলমে বা কমিশন গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি একটি কল রেকর্ড ছড়িয়ে পড়া এবং অবৈধ দখল-বেদখলের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদাহরণ দেন তিনি।

এমনকি প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতার আভাস পাওয়ার পর ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যকেও পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাঁর ভাষায়, সরকারি দলের সদস্য হলেই অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে, কিংবা পুলিশ সদস্য হলেই দায়িত্বে অবহেলার দায় থেকে রেহাই মিলবে—এমন ধারণার আর সুযোগ নেই।

র‌্যাব বিলুপ্তির পর গঠিত বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যক্রম ও জবাবদিহিতার কাঠামোও স্পষ্ট করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা এবং পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে জনতার আন্দোলন ও প্রতিরোধের সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোকে সেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে হবে।

জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের আইনি সুরক্ষার জন্য ‘জুলাই যোদ্ধা সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আইনটির স্থায়ী বৈধতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ রয়েছে।

তবে সাধারণ মানুষ ও জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বিচার অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালসহ দেশের প্রচলিত আদালতে এসব ঘটনার বিচার চলছে এবং প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী তাঁকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারকে বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ডিসেম্বরে তাঁর দেশে ফেরার গুঞ্জন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শেখ হাসিনা বর্তমানে সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত আসামি। দেশে ফিরলে তাঁকে অবশ্যই আইনের আওতায় নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ভারত সরকার কখনোই তাঁকে ফেরত দেবে না—এমন কথা বলেনি। বরং প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশ আশা করছে, ভারত একপর্যায়ে বিষয়টি অনুধাবন করে তাঁকে ফেরত পাঠানো হবে। 

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান গড়ে তুলেছিল। সেই আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি যে পলাতক ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীকে এ দেশের জনগণ আবার আহ্বান জানাবে।’

সালাহউদ্দিন আহমদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ এখনো গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেনি, ক্ষমা চায়নি কিংবা নিজেদের দায় স্বীকার করেনি। বরং আন্দোলনে অংশ নেওয়া জনগণকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে। এ কারণে দলটির রাজনৈতিক বৈধতা নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনার বক্তব্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারতে বসে দেওয়া এসব বক্তব্যের মাধ্যমে পলাতক নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন তিনি।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতে আপিলের সুযোগ থাকলে তিনি সেই অধিকার পাবেন। অন্যথায় আইন অনুযায়ী তাঁর সাজা কার্যকর করা হবে।

দেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকার বা রাজনৈতিকভাবে কোনো চাপ নেই বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের চাপ অনুভব করার কথা নয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনাকে পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর হামলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সাংবাদিকরা আইনের আশ্রয় নিয়ে মামলা করলে পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলাদেশি পরিচয়ে লোকজনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি সতর্ক অবস্থানে থেকে অবৈধ পুশইন ঠেকিয়েছে।

এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে নিয়মিত পতাকা বৈঠক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

দেশে সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমের অস্তিত্ব নেই বলেও দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, উগ্রবাদী ও চরমপন্থী তৎপরতা প্রতিহত করতে পুলিশের বিশেষায়িত রেসপন্স ইউনিট সব সময় প্রস্তুত রয়েছে।

আর /দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।