দক্ষিণ পূর্ব

মুঠোফোনে প্রেম, ডাকঘরে তালাকের চিঠি!

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৯ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:১৬ সকাল
পঠিত : ১৮
মুঠোফোনে প্রেম, ডাকঘরে তালাকের চিঠি!

ছবি

Degchibarictg

একসময় ডাকপিয়নের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতেন মানুষ। প্রিয়জনের হাতে লেখা কয়েকটি লাইন ঘিরে থাকত আবেগ, অপেক্ষা আর ভালোবাসার গল্প। সেই চিঠি কখনো ছিল প্রেমের বার্তা, কখনো দূরের স্বজনের খোঁজ। সময় বদলেছে, বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যমও। মুঠোফোন আর ইন্টারনেটের যুগে চিঠির সেই কদর এখন আর নেই। তবে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ডাকঘরগুলোতে চিঠির বদলে যে চিত্র সামনে আসছে, তা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রেমপত্রের দেখা না মিললেও নিয়মিত আসছে তালাকসংক্রান্ত চিঠি।

উপজেলার বিভিন্ন শাখা ডাকঘরে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কোথাও ঝুলছে তালা, কোথাও ডাকঘর ঘিরে জন্মেছে ঝোপঝাড়। যাতায়াতের পথও অনেক জায়গায় স্পষ্ট নয়। ডাকসেবার জন্য স্থাপিত এসব কার্যালয়ের অনেকগুলোতে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মাওহা ইউনিয়নের ভূটিয়ারকোনা ডাকঘরটির অবস্থান ঝোপঝাড়ের মধ্যে। কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিয়ন পরিষদ থাকলেও ডাকঘরে যাওয়ার নির্দিষ্ট রাস্তা নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, পোস্টমাস্টারকে নিয়মিত দেখা যায় না। ডাকঘরের সামনে আগাছা, গোবর ও আবর্জনা জমে রয়েছে।

কিল্লাতাজপুর, মুখুরিয়া, লামাপাড়া ও ভবানীপুরসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ডাকঘরেও একই ধরনের অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা গেছে। রামগোপালপুর, পাছারবাজার, শাহগঞ্জ ও বীরআহাম্মদপুর ডাকঘরে গিয়ে তালা ঝুলতে দেখা যায়। কোনো কোনো ডাকঘরের অবস্থান পরিবর্তন হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে সেগুলোর অবস্থান ও পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে।

ডাকঘরগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সরবরাহ করা হলেও এসব সরঞ্জামের অনেকগুলো নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও সেবার মান বাড়েনি প্রত্যাশা অনুযায়ী।

পাছার ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মো. আতাউর রহমান ১৯৯১ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর স্মৃতিতে ডাকঘরের পুরোনো দিনগুলো এখনো উজ্জ্বল। তিনি জানান, একসময় চিঠি পৌঁছে দিলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা আনন্দে ছুটে আসত। অনেক সময় বকশিসও পাওয়া যেত। কিন্তু মুঠোফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।

আতাউর রহমান বলেন, গত মাসে তাঁর ডাকঘরে ১৪টি তালাকনামা এসেছে। আদালত ও এনজিওর চিঠিও আসে। তবে গত দুই থেকে তিন বছরে কোনো প্রেমপত্র আসেনি।

লামাপাড়া ডাকঘরের পোস্টমাস্টার ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, সরবরাহ করা ইলেকট্রনিক সরঞ্জামগুলো দেওয়ার পরপরই নষ্ট হয়ে যায়। ভবানীপুর ডাকঘরের পোস্টমাস্টার মহসিন মাহমুদ শাহ বলেন, সরঞ্জামগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় সেগুলো অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে।

ডাকসেবার দুরবস্থার পেছনে অর্থসংকটের কথাও জানিয়েছেন কর্মীরা। আতাউর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, একজন পোস্টমাস্টার মাসে ৪ হাজার ৪৬০ টাকা, পিয়ন ৪ হাজার ৩৫৪ টাকা এবং রানার ৪ হাজার ১৭৭ টাকা বেতন পান। এত অল্প বেতনের মধ্যেও তাঁরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

গৌরীপুর প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার আমিনুল ইসলাম বলেন, শাখা ডাকঘরগুলোর অনিয়ম ও সমস্যার অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, উপজেলা ডাকঘরে মাসে অফিস খরচ বাবদ বরাদ্দ মাত্র ৮০ টাকা। এই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক সামগ্রী কেনাও কঠিন। বাজেটের সীমাবদ্ধতায় কার্যক্রম পরিচালনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আমিনুল ইসলাম আরও জানান, উপজেলার ১৪টি শাখা ডাকঘর ও উপজেলা ডাকঘর মিলিয়ে প্রতি মাসে আনুমানিক ১৬০ থেকে ১৮০টি তালাকপত্র আসে। সে হিসাবে বছরে এ সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, এলাকায় বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। গত বছরের নভেম্বরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তরুণ-তরুণীদের নামে কোনো প্রেমপত্র আসতে দেখেননি বলেও জানান তিনি।

একসময় মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও দূরত্বের গল্প বহন করত ডাকঘরের চিঠি। এখন সেই জায়গা দখল করেছে তাৎক্ষণিক ডিজিটাল যোগাযোগ। কিন্তু গৌরীপুরের ডাকঘরগুলোর চিত্র শুধু চিঠির হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের গল্প নয়; বরং সেবার অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। যে ডাকঘর একসময় মানুষের অপেক্ষার কেন্দ্র ছিল, সেখানে এখন চিঠির সংখ্যা কমার পাশাপাশি বাড়ছে তালাকনামার উপস্থিতি।

আর /দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।