সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭৩ জন নারী ও ৬১ জন শিশু। এছাড়া দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
রবিবার (৪ অক্টোবর) রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংগঠনটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে মোট নিহতের ৩২ দশমিক ৮৬ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। মাসজুড়ে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩৯ জন। এ ছাড়া সড়কে যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন।
চট্টগ্রামে ৭৯ দুর্ঘটনা, নিহত ৭৫
সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট দুর্ঘটনার ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ ঘটেছে। সারাদেশের ৪৪২টি দুর্ঘটনার মধ্যে এ বিভাগে দুর্ঘটনার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭৯টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৭৫ জন। বিভাগভিত্তিক প্রাণহানির হিসাবে ঢাকা বিভাগের পর চট্টগ্রাম বিভাগেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ হারিয়েই বেশি দুর্ঘটনা
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এমন দুর্ঘটনার সংখ্যা ১৬৮টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ।
এ ছাড়া ১০৯টি দুর্ঘটনায় পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ৯৮টি, আর পেছন থেকে ধাক্কার ঘটনা ঘটেছে ৬১টি। অন্যান্য কারণে ঘটেছে আরও ছয়টি দুর্ঘটনা।
সড়কের ধরন অনুযায়ী, আঞ্চলিক সড়কে সবচেয়ে বেশি ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মোটরসাইকেলেই প্রাণহানি বেশি
যানবাহনভিত্তিক হিসাবে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। থ্রি-হুইলারে ৮৮ জন, বাসে ২৬ জন, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপে ২১ জন এবং ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলিতে ১৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ছয়জন নিহত হয়েছেন।
সেপ্টেম্বরের দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ছিল ১৬২টি, থ্রি-হুইলার ১২৯টি, বাস ১১৩টি এবং ট্রাক ৯৩টি।
ঢাকায় প্রাণহানি সর্বোচ্চ
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। যা মোট দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৮৬ শতআংশ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে নিহতদের পেশাগত পরিচয়ও তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এতে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে ২ জন পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য, ১৩ জন শিক্ষক, তিনজন সাংবাদিক, দুজন চিকিৎসক, চারজন প্রকৌশলী, একজন কাস্টমস কর্মকর্তা, একজন বিদেশি নাগরিক, ব্যাংক-বীমার ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৮ জন এনজিও কর্মী এবং ২৪ জন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী রয়েছেন।
এছাড়া বিভিন্ন পর্যায়ের ২৫ জন ব্যবসায়ী, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর ২১ জন বিক্রয় প্রতিনিধি, তিনজন মসজিদের ইমাম বা খাদেম, চারজন মোটর মেকানিক, ছয়জন পোশাক শ্রমিক, একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ১৪ জন দিনমজুর এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫৮ জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, সকালে ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নৌ ও রেল দুর্ঘটনাও বেড়েছে
সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত এবং চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে। গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
সংস্থাটির মতে, যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ এবং চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
এছাড়া মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ এবং সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে সমন্বিত করে অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
জেএফআই/দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।