পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত কর্মকাণ্ড কীভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে, তা ব্যাখ্যা করার নতুন মডেল তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে চলতি বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল ও মাইকেল উডফোর্ড।
সোমবার রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের নাম ঘোষণা করে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিতে গবেষণার জন্য তাঁদের এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। হল যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং উডফোর্ড কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুই অর্থনীতিবিদ সামষ্টিক অর্থনীতির নতুন কিছু মডেল তৈরি করেছেন। এসব মডেল কার্যকর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নীতি গ্রহণের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। মডেলগুলোর সাহায্যে সঠিক সময়ে উপযুক্ত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করে অর্থনীতির বড় ধরনের উত্থান-পতন কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রায় এক শতাব্দী আগে অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তাঁর তত্ত্বগুলো অর্থনীতির ওঠানামা ও অস্থিরতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দার সময় সুদের হার কমানো ও বাজেট ঘাটতি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করার চেষ্টা করা হয়। অন্যদিকে, অর্থনীতি অতিরিক্ত গতিতে বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিপরীত নীতি নেওয়া হয়।
তবে সত্তরের দশকে তেল সংকটের সময় কেইনসের তত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সে সময় প্রচলিত মডেলগুলো বেকারত্ব কমাতে ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে সমালোচনা হয়। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘ সময় ধরে ধীর প্রবৃদ্ধি, উচ্চ বেকারত্ব ও চড়া মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হয়। তখন অনেকেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কেইনসের নীতি পুরোপুরি বাতিলের পক্ষে মত দেন।
এ পরিস্থিতিতে হল ও উডফোর্ড সামষ্টিক অর্থনীতির মডেল নতুনভাবে সাজানোর পথ দেখান। মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ও ভোগের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের পরিসংখ্যানগত সম্পর্কের ওপর নির্ভর না করে তাঁরা ব্যষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিতে মডেল তৈরি করেন।
এই মডেলগুলোর মাধ্যমে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পৃথক সিদ্ধান্ত কীভাবে পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে, তা ব্যাখ্যা করা যায়। দুই অর্থনীতিবিদ দেখিয়েছেন, পরিবার ও ব্যবসায়ীরা শুধু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেয় না; ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে, সেটিও তাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যৎ নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হয়। নোবেল কমিটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তাঁদের তৈরি মডেল ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় ভূমিকা রেখেছে।
অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার কমিটির প্রধান জন হাসলার বলেন, পুরস্কার বিজয়ীদের গবেষণা অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষণের জন্য একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে। এ ভিত্তির ওপর তৈরি মডেলগুলো বিভিন্ন দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবহার করছে।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানি সংকট কিংবা মানুষের ভোগের ধরনে আকস্মিক পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতিতে এসব মডেল অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে আগের চেয়ে বেশি সহায়তা করবে।
গত বছর টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছিলেন আমেরিকান-ইসরায়েলি অর্থনীতিবিদ জোয়েল মোকিয়র, ফ্রান্সের ফিলিপ আগিয়োঁ ও কানাডার পিটার হাউইট।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।