চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় ২৪ দশমিক ৯৬ শতক সরকারি জমি দখলে রেখে নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ না করা এবং জাল রেকর্ডপত্র তৈরি করে তা ব্যবহার করার অভিযোগে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলাটি করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন—ফাতেমা বেগম, মো. ফরিদ আহমদ, মোহাম্মদ ফাহিম আহমেদ, হাসিনা মমতাজ, মোহাম্মদ ফয়েজ আহমদ, রোকেয়া সুলতানা, শাহীন সুলতানা এবং চট্টগ্রাম গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২-এর সাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও বর্তমানে বাগেরহাট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হওয়া এবং অন্যকে লাভবান করার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ভুয়া রেকর্ডপত্র তৈরি করেন। পরে এসব রেকর্ডপত্র আসল হিসেবে ব্যবহার করে সরকারি জমি ভোগদখলে রাখেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের আওতায় থাকা জমিটি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার গোসাইলডাঙ্গা মৌজায়। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার লে-আউট প্ল্যানের ১৬ নম্বর প্লটটির আয়তন ২৪ দশমিক ৯৬ শতক। দুদকের হিসাবে, ২০২৫ সালের মৌজা রেট অনুযায়ী বাড়ি বাদে জমিটির মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ ৬৩ হাজার ১৪০ টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, জমিটির ওপর থাকা ভবনের ভাড়া বাবদ ২০০৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারি হারে ৬ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ২১ লাখ ৮ হাজার ৩১৬ টাকা পরিশোধ করা হলেও বাকি থাকে ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮ টাকা।
জমির মূল্য ও বকেয়া ভাড়া মিলিয়ে মোট ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০০২ সালে মেসার্স কনকর্ড ট্রেডিং কোম্পানির পক্ষে মো. ফরিদ আহমদ ও হাসিনা মমতাজ ওই ভবন ও জমি লিজ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে মাসিক ভাড়া ৩৯ হাজার ৫৩৫ টাকা নির্ধারণ করে ২০০৩ সালের ৭ জুন সরকারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর ভাড়া দেওয়া হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লিজ নবায়ন করা হয়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
দুদকের দাবি, লিজ নবায়ন না হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টরা জমি ও ভবনটি দখলে রাখেন। বর্তমানে ভবনটির বিভিন্ন অংশে কনকর্ড ট্রেডিং, একটি মেডিকেল সেন্টার ও আগ্রাবাদ কনভেনশন হল পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের একটি অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়ার তথ্যও অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ফাতেমা বেগম ১৯৭০ সালের একটি দলিলের মাধ্যমে জমিটির মালিকানা দাবি করেন। তবে অনুসন্ধানে ওই দলিলের মূল বা সার্টিফায়েড কপি পাওয়া যায়নি। দলিলটির সত্যতা নিয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে বলে দুদক উল্লেখ করেছে।
পরে ওই রেকর্ডপত্র ব্যবহার করে জমিটির নামজারির আবেদন করা হয়। দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, গণপূর্ত বিভাগের তৎকালীন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহ-আলম ফারুক সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে নামজারির অনুমতি দেওয়া হয়।
২০২০ সালে ফাতেমা বেগম জমিটি তার চার সন্তান মোহাম্মদ ফয়েজ আহমদ, হাসিনা মমতাজ, রোকেয়া সুলতানা ও শাহীন সুলতানার নামে হেবা করে দেন। বর্তমানে জমিটি ‘ফাতেমা হাইটস’ নামে ভোগদখলে রয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি সম্পত্তির আর্থিক মূল্য ১৭ কোটি ১২ লাখ ৬৩ হাজার ১৪০ টাকা এবং বকেয়া ভাড়া ৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯৮ টাকা। এই দুই অঙ্ক মিলিয়ে মোট ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৩৯ হাজার ২৩৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার তদন্ত চলাকালে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার ঘটনাস্থল হিসেবে গোসাইলডাঙ্গা মৌজা, ডবলমুরিং, আগ্রাবাদ ও অন্যান্য স্থান উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের সময়কাল ২০০২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।