চট্টগ্রামে ডেঙ্গু এখন শুধু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, একের পর এক পরিবারে তৈরি করছে অপূরণীয় শূন্যতা। বিশেষ করে শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও সদ্য মা হওয়া নারীর মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।একদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে শিশু ও নারীদের মৃত্যুর ঘটনা পরিবারগুলোর মধ্যে বাড়াচ্ছে আতঙ্ক। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২২৭ জন ডেঙ্গু রোগী।
মাত্র এক মাস ছয় দিন আগে দ্বিতীয় সন্তানের মা হয়েছিলেন রাশেদা বেগম। ঘরজুড়ে তখন নতুন অতিথির আনন্দ। সাড়ে চার বছরের ছেলেটিও পেয়েছিল ছোট ভাই। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন রাশেদা। স্বামী, সাড়ে চার বছরের ছেলে আর দুধের শিশুকে রেখে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া রাশেদা বেগম ছিলেন সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীন বাউরিয়া ইউনিয়নের একজন স্বাস্থ্য সহকারী। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালে স্বাস্থ্য সহকারী পদে যোগ দেওয়া রাশেদা দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পর মাতৃত্বকালীন ছুটিতে চট্টগ্রামের বাসায় ছিলেন। দক্ষিণ কাট্টলী ছদু চৌধুরী সড়কের একতা আবাসিক এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর জ্বর শুরু হয়। পরদিন পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন তাঁর মৃত্যু হয়।
রাশেদার স্বামী আমিরুল ইসলাম কাট্টলী মোস্তফা হাকিম ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক। তাঁদের সাড়ে চার বছরের একটি ছেলে এবং এক মাস ছয় দিন বয়সী আরেকটি সন্তান রয়েছে।
সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা মানস বিশ্বাস বলেন, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর এভাবে মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন।
রাশেদার মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই আরেকটি পরিবারে নেমে আসে আরও ভয়াবহ শোক। ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা অর্পিতা দাশও ডেঙ্গুর কাছে হার মানেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়; মৃত্যুর পর জন্ম নেয় তাঁর মৃত পুত্রসন্তান। আগামী ১২ অক্টোবর যে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায় ছিলেন অর্পিতা ও তাঁর পরিবার, সেই সন্তানকে আর কোলে নেওয়া হলো না মায়ের।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জ্বর অনুভূত হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৬ সেপ্টেম্বর অর্পিতার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চিকিৎসকেরা জানান, অর্পিতা ডেঙ্গু এক্সপান্ডেড সিনড্রোমে ভুগছিলেন। তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে প্লাটিলেট দেওয়া হলেও শুক্রবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর গর্ভস্থ মৃত পুত্রসন্তান প্রসব হয়।
এরই মধ্যে ডেঙ্গুতে মারা গেছে আট বছরের শিশু আবরার। হালিশহর এলাকার এই শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। ৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ছয় দিন পর ৯ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। পরীক্ষায় এনএসওয়ান পজিটিভ আসার পর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল তার। মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ডেঙ্গু এক্সপান্ডেড সিনড্রোম’।
জানা যায়,গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রকাশিত দৈনিক ডেঙ্গু রোগীর বিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিবরণী অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ জন, ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ১০ জন, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন এবং চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) দুজন ভর্তি হয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি হয়েছেন আরও ছয়জন।
এ নিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৯৬ জনে। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৩৮০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৪১৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
এ সময়ে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ৫৬৯ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২২৭ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর/ দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।