দক্ষিণ পূর্ব

১২ বছরের ময়লা সরালেন ব্যবসায়ীরা

‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, ফুলও দেয়’

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:১৪ সকাল
পঠিত : ১৭
‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, ফুলও দেয়’

ছবি

Degchibarictg

সরকারি কর্মকর্তাদের ফুল দিয়ে স্বাগত জানানোর দৃশ্য খুবই পরিচিত। তবে চট্টগ্রামে দেখা গেল এর ব্যতিক্রম। ফুল নিতে নয়, ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে ফুল ও সম্মাননা স্মারক নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে হাজির হলেন জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস) শপিং কমপ্লেক্সে প্রায় এক যুগ ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ ময়লা-আবর্জনা নিজেদের উদ্যোগে অপসারণ করায় ব্যবসায়ীদের এ সম্মাননা দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) নগরের কাজীর দেউড়িতে এম এ আজিজ স্টেডিয়ামসংলগ্ন সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সে গিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের হাতে ফুল ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও সিজেকেএস সভাপতি মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

এ সময় জেলা প্রশাসক বলেন, ‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, জেলা প্রশাসন ফুলও দেয়।’

সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সের গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকায় বছরের পর বছর ধরে ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণবর্জ্য জমে বড় স্তূপে পরিণত হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের হিসাবে, সেখানে আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য জমেছিল। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে এসব আবর্জনা সেখানে পড়ে ছিল।

বর্জ্যের স্তূপে দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটছিল। একই সঙ্গে মশার প্রজনন এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। জেলা প্রশাসক জানান, এসব বর্জ্যের মধ্যে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন লাগলে পাশের মার্কেট ও এম এ আজিজ স্টেডিয়ামও ঝুঁকিতে পড়তে পারত।

‘পরিচ্ছন্ন করি নগর-গ্রাম, গড়ি নান্দনিক চট্টগ্রাম’ স্লোগানে চট্টগ্রামজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রম চালাচ্ছে জেলা প্রশাসন। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসকের তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদে একযোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। ডেঙ্গুর হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত সীতাকুণ্ডের পর কর্ণফুলীতেও বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নজরে আসে সিজেকেএস শপিং কমপ্লেক্সের দীর্ঘদিনের বর্জ্যের স্তূপ।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর সিজেকেএসের অ্যাডহক কমিটির সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শপিং কমপ্লেক্স দোকান মালিক ও ব্যবসায়ী সমিতি নিজেদের উদ্যোগে বর্জ্য অপসারণ শুরু করে। কয়েক দিনের মধ্যেই সরিয়ে ফেলা হয় দীর্ঘ ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ আবর্জনা।

দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন বলেন, নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জায়গাটি পরিষ্কার করার পরিকল্পনা ছিল। জেলা প্রশাসনের উৎসাহ ও সহযোগিতা পাওয়ার পর তাঁরা কাজে নামেন।

তবে কাজের স্বীকৃতি দিতে জেলা প্রশাসক নিজেই ফুল নিয়ে আসবেন, তা ভাবেননি তিনি।

কামাল হোসেন বলেন, ‘ডিসি মহোদয় নিজে এসে আমাদের ধন্যবাদ জানাবেন, ফুল দিয়ে উৎসাহিত করবেন—এটা ভাবিনি। তাঁর এই স্বীকৃতি আমাদের উৎসাহিত করেছে।’

সমিতির সভাপতি মুকলেসুর রহমান বলেন, কোনো কিছু পাওয়ার আশায় তাঁরা কাজটি করেননি। মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসকের দেওয়া স্বীকৃতি তাঁদের জন্য বড় প্রাপ্তি।

সিজেকেএসের সদস্যসচিব মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, সাধারণত কোনো কর্মকর্তা কোনো প্রতিষ্ঠানে গেলে তাঁকেই ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। এখানে ঘটেছে উল্টো ঘটনা।

তিনি বলেন, ‘ডিসি সাহেব নিজেই এসে যাঁরা কাজটি করেছেন, তাঁদের ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এমন ঘটনা আমি আগে দেখিনি।’

ব্যবসায়ীদের সম্মাননা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে একটি শহরকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। এজন্য নাগরিকদের মধ্যেও দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে।

তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন শুধু ফুল নেয় না, জেলা প্রশাসন ফুল দেয়। আমরা তাঁদের হাতে আজ ফুল দিয়েছি। ভালো কাজের জন্য স্মারক উপহার দিয়েছি।’

শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক বর্জ্য অপসারণ সহজ কাজ ছিল না উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘হয়তো এই ফুল সামান্য। কিন্তু তাঁদের প্রতি আমার যে ভালোবাসা, যে সম্মান—সেটা অনেক বড়। সেই সম্মান দেখাতেই আজ তাঁদের কাছে এসেছি।’

এ কাজ তাঁর সরকারি চাকরিজীবনের স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি হয়ে থাকবে বলেও জানান তিনি।

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা যারা সরকারি চাকরি করি, চাকরিজীবনের কিছু কাজ স্মৃতিকোঠায় থেকে যায়। সুন্দর একটি স্টেডিয়াম ও মার্কেটের পাশে ১২ বছর ধরে জমে থাকা ২০০ থেকে ২৫০ ট্রাক ময়লার স্তূপ অপসারণ—আমার মনে হয়, এই কাজটি আমার স্মৃতিতে থেকে যাবে।’

বর্জ্য অপসারণের পর জায়গাটি আর আগের অবস্থায় ফেলে রাখা হবে না। সেখানে বাগান করার পরিকল্পনা নিয়েছে জেলা প্রশাসন। থাকবে বসার জায়গা ও পানির ব্যবস্থা। পুরো এলাকাটিকে সৌন্দর্যবর্ধনের আওতায় আনা হবে।

ভবিষ্যতে যাতে সেখানে আবার ময়লা-আবর্জনা জমতে না পারে, সে জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। কেউ অবৈধভাবে ময়লা ফেললে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এখানে কোনো ছাড় আমি দেব না।’

প্রায় এক যুগ ধরে জমে থাকা আবর্জনা কয়েক দিনের উদ্যোগে সরিয়ে এখন সেই জায়গায় বাগান করার পরিকল্পনা চলছে। আর এই পুরো উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য—যে প্রশাসন সাধারণত ফুল গ্রহণ করে, সেই প্রশাসনই এবার ফুল নিয়ে গেছে নাগরিকের কাছে, ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে।

আর/ দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।