দক্ষিণ পূর্ব

চবি ক্যাম্পাসের রহস্যময় প্রেমিক পুরুষ বারী ভাই

sathi
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৫
পঠিত :
চবি ক্যাম্পাসের রহস্যময় প্রেমিক পুরুষ বারী ভাই
আবু শাহেদ

'সবার জীবনে প্রেম আসে
তাইতো সবাই ভালোবাসে
প্রথম যারে লাগে ভালো
যায় না ভোলা কভু তারে।'
অ্যান্ড্রু কিশোর ও রিজিয়া পারভিনের গাওয়া 'ভাঙচুর' ছবির সেই বিখ্যাত গানের কথা যেন বাস্তবে ধরা দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। হ্যাঁ, প্রথম প্রেম পূর্ণতা না পাওয়ার যন্ত্রণাকে ভুলতে না পারার কষ্ট বুকের ভেতর পুষে রেখে একজন ক্যাম্পাসে কাঁটিয়ে দিয়েছেন ২৫ বসন্ত। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হল পেরিয়ে হতাশার মোড়, শহীদ মিনার থেকে ঝুঁপড়ি—এই মুখরিত ক্যাম্পাসে দেখা মিলবে সেই তাকেই। তার কাহিনি যেন জীবন্ত এক উপন্যাস; যেখানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, আছে এক অবিনাশী অপেক্ষা।

নিঃসঙ্গ অথচ সেই পরিচিত মুখের নাম শফিকুল বারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীদের কাছে যিনি খ্যাত 'বারী ভাই' নামে!

১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়ে শুরু হয়েছিল বারীর বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন। সেই শুরু, আর যেন শেষ নেই। সময় বয়ে গেছে—ক্যাম্পাসে এসেছেন নতুন শিক্ষার্থী, বেরিয়ে গেছে ব্যাচের পর ব্যাচ। কিন্তু বারী ভাই রয়ে গেছেন একইরকম: প্রীতিলতা হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ ছায়ার মতো। কখনো ভোরের আলো ফোটার আগে, কখনো বিকেল গড়ালে, আবার কখনো সন্ধ্যার নিঃসঙ্গতায়—তাকে দেখা যায় সেই পুরনো জায়গাগুলোতে বসে থাকতে, যেখানে একদিন হয়তো তিনি অপেক্ষা করেছিলেন ভালোবাসার মানুষটির জন্য।

মেয়েটিকে খুব ভালোবেসেছিলেন। কিন্তু সে ভালোবাসা কেবল মনে গাঁথা এক কবিতাই থেকে গেছে। কখনো মুখ ফুটে বলতে পারেননি—'আমি তোমায় ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি।'

আর সেই অব্যক্ত ভালোবাসার ফলেই হয়তো বারী জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছেন নিঃসঙ্গতায়। প্রেয়সীর বিয়ে হয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু তার প্রতীক্ষা থেমে নেই। সেই একই আবেগ নিয়ে এখনও হাঁটেন শহীদ মিনারের পথ ধরে, বসে থাকেন চুপচাপ ঝুপড়ির আড়ালে। বয়স ৫০ এর ঘরে পৌঁছালেও নিজেকে এখনো তিনি ভাবেন সেই তরুণ প্রেমিক হিসেবে।

এই দীর্ঘ যাত্রায় শফিকুল বারী শুধু বিরহেই থেমে থাকেননি। পড়েছেন, জেনেছেন, শিখেছেন। অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রির পর এমবিএ, ইংরেজি সাহিত্য, কম্পিউটার বিজ্ঞানসহ ১৭টিরও বেশি বিষয়ে নিয়েছেন উচ্চশিক্ষা। এখন পড়ছেন দাওরায়ে হাদিস, হাটহাজারী মাদ্রাসায়। তার জানার আগ্রহ, শিক্ষার পিপাসা যেন তাকে করেছে এক চলমান গ্রন্থাগার।

বারীর বাড়ি চট্টগ্রাম থেকে বহুদূরে, বগুড়ায়। পিতা ছিলেন মুহাদ্দিস, পরিবারে শিক্ষিত-প্রতিষ্ঠিত সদস্যদের ভিড়ে তিনি যেন ব্যতিক্রম এক অধ্যায়। চিকিৎসক ভাই-ভাবি, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত ভাগ্নে-ভাগ্নিরা—সবকিছুতেই পরিপূর্ণতা, শুধু নিজের জীবনে রয়েছে এক অনুচ্চারিত শূন্যতা।


এদিকে, এক সময়ের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীদের ভালোবাসার 'বারী ভাই'  ইদানিং অনেক ছাত্রীর কাছেই অস্বস্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ছাত্রী হলের মুখে তাঁর পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকা মানতে পারছে না অনেকেই। তাই মাঝে মাঝে তাঁকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার দাবিও ওঠে। কিন্তু কিছুতেই যেন প্রেয়সীর রেখে যাওয়া ক্যাম্পাস ছেড়ে দূরে কোথাও যাবেন না তিনি!

 গত কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়েছে সমাবর্তন। কিন্তু বারী ভাই অফিসিয়ালি থাকতে পারেননি সেই প্রাণের উচ্ছ্বাসে।  কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে সম্প্রতি  ইভটিজিংয়ের অভিযোগ করেন কয়েকজন ছাত্রী।এনিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে সমাবর্তনের জন্য আবেদন করতে দেননি। তবুও আশাবাদী ছিলেন প্রেমিক বারী।  সেই আশায় লিখেছেন আবেদন—রাষ্ট্রপতির কাছে, চ্যান্সেলরের কাছে, যেন একবার অন্তত স্বপ্নের সেই সমাবর্তন মঞ্চে পা রাখতে পারেন।

বারীর জীবনের গল্প শুনে অনেকেই আশ্চার্য হন। ভাবেন, না বলা প্রেম হয়তো এভাবেই দীর্ঘ হয়ে ওঠে এক জীবনের সমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে চিরতরুণ এই মানুষটি তাই রয়ে যান এক চলমান কবিতা হয়ে। যে কবিতার শেষ নেই। আছে শুধু একরাশ বিস্ময়..

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।