কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ২২ নম্বর ক্যাম্পে বসবাসকারী প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা বর্তমানে সীমিত পরিমাণ পানির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দেখা দেওয়া এ সংকট শুষ্ক মৌসুমে আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে একটি পরিবারের জন্য দিনে প্রায় ২০ লিটার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে শুষ্ক মৌসুমে সরবরাহ আরও কমে ৫ থেকে ১৫ লিটারে নেমে আসে। এতে রান্না, গোসলসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের।
২২ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা আবদুল আমিন বলেন, জরুরি মানবিক সহায়তায় কোনোভাবে সংসার চললেও পানির সংকটে তাদের দৈনন্দিন জীবন প্রায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
আরেক বাসিন্দা হামিদ হোসেন বলেন, বর্ষাকালেও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। শুষ্ক মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। তখন পানি দিয়ে রান্না করলে গোসলের সুযোগ থাকে না, আবার গোসল করলে রান্নার পানি থাকে না।
তথ্য অনুযায়ী, ২২ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দাদের জন্য সরবরাহ করা পানির প্রধান উৎস পাশের একটি খাল। শুষ্ক মৌসুমে ওই খালেও পানি কমে গেলে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি ছড়া থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
ক্যাম্পে একটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন সকাল ও দুপুরে দুই দফায় পানি দেওয়া হয়। পাম্প চালু হলে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বোতল ও বিভিন্ন পাত্রে পানি সংগ্রহ করতে হয় বাসিন্দাদের।
উপজেলা প্রশাসন জানায়, টেকনাফের ভূমি পাথুরে হওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা কঠিন। ফলে উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেই পানির সংকট রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আসার পর ক্যাম্পগুলোতে হাজার হাজার নলকূপ স্থাপন করা হয়। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়ে যায়। বর্তমানে অল্প কয়েকটি অগভীর নলকূপ ও খালের পানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে।
পানির সংকট মোকাবিলায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিসেফের অনুদানে ২২ নম্বর ক্যাম্পে একটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ করে অক্সফ্যাম। প্ল্যান্টটির নির্মাণ ও পরিচালনায় সহযোগিতা করছে দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)। তবে এতেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, উখিয়া ও টেকনাফজুড়েই পানির সংকট রয়েছে। তবে টেকনাফে পরিস্থিতি বেশি প্রকট। সেখানে পর্যাপ্ত ভূগর্ভস্থ পানি নেই এবং ভূমি পাথুরে হওয়ায় সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করতে হচ্ছে। শীতকালে সংকট আরও বেড়ে গেলে পানি রেশনিং করতে হয়।
তিনি জানান, বর্তমান প্ল্যান্টে পানি তোলার জন্য ছয়টি প্রাথমিক সেডিমেন্টেশন ট্যাংক রয়েছে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৯৫ হাজার লিটার। এছাড়া চার পাহাড়ে ৯৫ লিটারের চারটি বিতরণ ট্যাংক রয়েছে। প্ল্যান্ট থেকে সর্বোচ্চ তিন কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত পানি সরবরাহ করা সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় টেকনাফে বড় আকারের সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান মিজানুর রহমান। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) পাইপলাইনের মাধ্যমে টেকনাফে পানি সরবরাহের একটি প্রকল্প নিয়েছে। প্রকল্পটি চালু হতে আরও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।