দক্ষিণ পূর্ব

দান-সদকা করবেন কাদের?

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ৬ নভেম্বর ২০২৬ ০৫:৫৬ সকাল
পঠিত : ৩৮
দান-সদকা করবেন কাদের?

ছবি

Degchibarictg

দান-সদকা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটি শুধু অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যম নয়, বরং সমাজে সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলারও অন্যতম উপায়। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে দান-সদকার অসংখ্য ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। তবে দান করার ক্ষেত্রে শুধু অর্থ ব্যয় করাই যথেষ্ট নয়, বরং প্রকৃত অভাবী ও হকদার ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে সহযোগিতা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা নিজেদের সম্পদ রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তাদের প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা বাকারা: ২৭৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) দান-সদকার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করো, যদিও তা একটি খেজুরের অংশ দান করার মাধ্যমে হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬০২৩)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো সেই দিন আসার আগে, যেদিন কোনো বেচাকেনা, বন্ধুত্ব কিংবা সুপারিশ কাজে আসবে না।’ (সুরা বাকারা: ২৫৪)

দান-সদকা হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

ইসলামে দান-সদকার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। লোক দেখানো, নিজের প্রভাব বিস্তার কিংবা দান করে কাউকে অপমান করা ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দানকে সেই ব্যক্তির মতো নিষ্ফল করো না, যে লোক দেখানোর জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করে।’ (সুরা বাকারা: ২৬৪)

প্রকাশ্যে দান করার সুযোগ থাকলেও গোপনে দান করাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা উত্তম। আর যদি তা গোপনে অভাবীদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও কল্যাণকর।’ (সুরা বাকারা: ২৭১)

তাই দান করার ক্ষেত্রে নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা, হালাল ও পবিত্র সম্পদ থেকে ব্যয় করা এবং প্রকৃত অভাবীদের কাছে সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

কাদের দান করা যাবে?

পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে জাকাত পাওয়ার যোগ্য আট শ্রেণির মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী তারা হলেন—

1. ফকির: যাদের কিছু সম্পদ থাকলেও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নন।

2. মিসকিন: যারা সম্পদহীন কিংবা মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য রাখেন না।

3. জাকাত আদায়কারী: ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা।

4. মন জয় করার উদ্দেশ্যে: ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট বা সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তিদের সহায়তা। এ খাতের বিধান নিয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

5. দাসমুক্তি: দাসপ্রথা বিদ্যমান থাকাকালে দাসদের মুক্ত করার জন্য এ খাত নির্ধারিত ছিল।

6. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যারা বৈধ প্রয়োজনে ঋণগ্রস্ত হয়েছেন এবং তা পরিশোধে অক্ষম।

7. আল্লাহর পথে: ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এ খাতে নির্দিষ্ট কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত।

8. মুসাফির: সফরকালে অর্থ বা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অসহায় হয়ে পড়া ব্যক্তি।

তবে সাধারণ দান-সদকা এবং ফরজ জাকাতের বিধান এক নয়। জাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত শরয়ি শর্ত অনুসরণ করা আবশ্যক।

দান করার ক্ষেত্রে যাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত

প্রকৃত হকদারের কাছে দান পৌঁছে দিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা ও ইসলামী নির্দেশনায় কয়েকটি শ্রেণির মানুষের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

১. যারা অভাবের কথা কাউকে বলতে পারেন না

সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা আর্থিক সংকটে থাকলেও আত্মসম্মান, ব্যক্তিত্ব কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কারও কাছে সাহায্য চান না। বাইরে থেকে তাঁদের দেখে অভাব বোঝার উপায় থাকে না। অথচ নীরবে তাঁরা কষ্টের জীবন পার করেন।

পবিত্র কোরআনে এ ধরনের মানুষের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে সাহায্য চায় না বলে অজ্ঞ ব্যক্তিরা তাদের অভাবমুক্ত মনে করে। তুমি তাদের চেহারা দেখে চিনতে পারবে।’ (সুরা বাকারা: ২৭৩)

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত অভাবী সে নয়, যে মানুষের কাছে ঘুরে ঘুরে খাবার বা সামান্য সাহায্য চায়। বরং প্রকৃত অভাবী হলো সেই ব্যক্তি, যার অভাব রয়েছে, কিন্তু আত্মসম্মানবোধের কারণে মানুষের কাছে হাত পাততে পারে না। (সহিহ বুখারি: ১৪৭৯; সহিহ মুসলিম: ১০৩৯)

তাই দান করার সময় এমন নীরব অভাবীদের খুঁজে বের করে সহযোগিতা করা উচিত।

২. নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশী

দান-সদকার ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম। এতে একদিকে যেমন দানের সওয়াব পাওয়া যায়, অন্যদিকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার দায়িত্বও পালন হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিকটাত্মীয়কে তার প্রাপ্য অধিকার দাও।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মিসকিনকে দান করলে একটি সওয়াব পাওয়া যায়। আর আত্মীয়কে দান করলে দুটি সওয়াব পাওয়া যায়—একটি দানের, অন্যটি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার। (জামে তিরমিজি: ৬৫৮)

তবে শুধু আত্মীয়দের মধ্যেই দান সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। আত্মীয়ের বাইরে কোনো ব্যক্তি যদি বেশি অভাবী হন, তাহলে তাঁর প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

৩. বেশি অভাবী ও সংকটাপন্ন মানুষ

দান-সদকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রয়োজনের গুরুত্ব বিবেচনা করা। পরিচিত দরিদ্রদের মধ্যে কেউ যদি অন্যদের তুলনায় বেশি অসহায় হন কিংবা জরুরি চিকিৎসা, খাবার, বাসস্থান বা অন্য কোনো মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে না পারেন, তাহলে তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

অনেক সময় সামান্য সহযোগিতাই একজন অসহায় মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাই দানের অর্থ কোথায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা বিবেচনা করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া জরুরি।

দান হোক মানবিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য

ইসলামে দান-সদকা কেবল সম্পদ বিতরণের বিষয় নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার প্রকাশ। তাই দান করার আগে প্রকৃত হকদার খুঁজে বের করা, গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং কাউকে ছোট না করে সহযোগিতা করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে বিশুদ্ধ নিয়তে দান-সদকা করার এবং প্রকৃত অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরএইচ 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।