দক্ষিণ পূর্ব

সাক্ষাৎকার এম এ মতিন

নির্বাচনের পর সুন্নি আলেম ও দরবারগুলোকে ভুলে যায় রাজনৈতিক দলগুলো

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:২১ রাত
পঠিত : ৩৪
নির্বাচনের পর সুন্নি আলেম ও দরবারগুলোকে ভুলে যায় রাজনৈতিক দলগুলো

ছবি দক্ষিণপূর্ব

জুহায়ের ফাতিন ইশতিয়াক

বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের চেয়ারম্যান এম এ মতিন বলেছেন, নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সুন্নি আলেম ও দরবারগুলোর সম্পর্ক পরে ভুলে যাওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চট্টগ্রাম সফরে বৃহত্তর সুন্নি ও দরবারকেন্দ্রিক জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি। 

এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদে তার দলকে মতামত দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ায় সেটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না বলেও জানান এই সুন্নি নেতা।

সমসাময়িক রাজনীতি, জুলাই জাতীয় সনদ ও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে দক্ষিণপূর্বকে খোলামেলা মতামত দিয়েছেন এম এ মতিন।

দক্ষিণপূর্ব: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চট্টগ্রাম সফরকে কীভাবে দেখছেন?

এম এ মতিন: প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরকে স্বাগত জানাই। রাষ্ট্রের প্রধান কোনো জেলায় সফর করলে মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়। জেলার সমস্যা ও উন্নয়ন সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তও দিতে পারেন। তাই চট্টগ্রামকে সফরের জন্য বেছে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাই। আশা করি, ভবিষ্যতে তিনি চট্টগ্রামের দিকে আরও বেশি নজর দেবেন। এই অঞ্চলে এখনো অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি থাকবে, এটাই প্রত্যাশা।

দক্ষিণপূর্ব: চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও মানুষের প্রত্যাশার জায়গা থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপনাদের বিশেষ কোনো দাবি আছে?

এম এ মতিন: চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু সেই তুলনায় নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামো এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা, তিনি চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দেবেন। শুধু তাৎক্ষণিক ঘোষণা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

দক্ষিণপূর্ব: চট্টগ্রামে সুন্নি আলেমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আপনাদের প্রত্যাশায় কি কোনো ঘাটতি তৈরি হয়েছে?

এম এ মতিন: প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সব মানুষের প্রধানমন্ত্রী। তিনি কোনো একক গোষ্ঠীর নন। সব সম্প্রদায়ের প্রতি তার সমান দায়িত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ধর্মীয় কর্মসূচি যারা নির্ধারণ করেছেন, সেখানে একপেশে চিন্তার প্রতিফলন দেখেছি। কর্মসূচি নির্ধারণে আরও ভারসাম্য রাখা উচিত ছিল। এতে তার সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা তৈরি হতো।

দক্ষিণপূর্ব: কোন বিষয়গুলোকে আপনি ভারসাম্যহীন মনে করছেন?

এম এ মতিন: প্রধানমন্ত্রী দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গেছেন। এটাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু চট্টগ্রামের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সুন্নি জনগোষ্ঠীর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল।  

তিনি ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসায় গেছেন। এর কাছেই মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফ। এছাড়া তার যাত্রাপথে রয়েছে জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা। এটি উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। কর্মসূচিতে সেখানে সংক্ষিপ্ত পাঁচ মিনিট পরিদর্শনের সুযোগ রাখা হলে ভালো হতো।  

এটা বেশি সময়ের বিষয় ছিল না। কিন্তু এর মাধ্যমে বৃহত্তর একটি জনগোষ্ঠীর প্রতি সম্মান দেখানো যেত।

দক্ষিণপূর্ব: সুন্নি আলেম ও দরবারগুলোর সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর যে সম্পর্ক নির্বাচনের আগে তৈরি হয়, নির্বাচনের পরও কী সেই সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে?

এম এ মতিন: নির্বাচন এলে রাজনৈতিক নেতারা সব সম্প্রদায়ের কাছে আপন হন। সবাইকে বন্ধু মনে করেন। কিন্তু নির্বাচন শেষে অনেকে প্রতিশ্রুতি ও সম্পর্কের কথা ভুলে যান। এটি দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা দীর্ঘদিন এটি দেখছি। বড় দলগুলোর নেতারা প্রচারণার আগে শাহজাল (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও বিএনপির অনেক প্রার্থী শাহ আমানত (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেছেন।  

যদি এটি অন্তরের বিশ্বাস থেকে হয়, তাহলে নির্বাচনের পরও সেই শ্রদ্ধা রাখা উচিত। নির্বাচনের সময় যার নাম স্মরণ করে, পরে তাকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।  

এটা ওলিদের জন্য দুর্ভাগ্য নয়। দুর্ভাগ্য তাদের, যারা নির্বাচনের সময় ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করে পরে ভুলে যান।

দক্ষিণপূর্ব: জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে আপনার দলের অবস্থান কী?

এম এ মতিন: জুলাই সনদ নিয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বারবার বলেছি, সনদে কী থাকছে সে বিষয়ে আমাদের মতামত নেওয়া হয়নি। আমাদের মতামত দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।  

একটি নিরপেক্ষ সরকারের দায়িত্ব ছিল সব দলের মতামত নেওয়া। কয়েকটি দলের মতামতের ভিত্তিতে সনদ তৈরি করলে সেটিকে সর্বজনীন বলা যাবে না। আমি নিজে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করিনি। আমার মতামত নেওয়া হয়নি। তাই এই সনদের বিষয়ে আমার কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এ কারণে এটিকে আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করি না।

দক্ষিণপূর্ব: স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি কতটা এগিয়েছে?

এম এ মতিন: স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। কর্মী-সমর্থকদের ভোট দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। রুট লেভেলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।  

বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর পদকে গুরুত্ব দিচ্ছি। তৃণমূলে সাংগঠনিক প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে এবং মানুষ নিজের ভোট নিজে দিতে পারলে, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ভালো ফল করবে।

দক্ষিণপূর্ব: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে আপনাদের উদ্বেগ কোথায়?

এম এ মতিন: সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ আছে। একদিকে প্রশাসনের অপব্যবহারের আশঙ্কা। যারা ক্ষমতার কাছাকাছি, তাদের পক্ষে প্রশাসন ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ থাকে। অন্যদিকে নির্বাচনে সন্ত্রাস ও কালো টাকার প্রভাব আছে। প্রশাসন, সন্ত্রাসী শক্তি ও কালো টাকা- এই তিনটি বিষয় নিরপেক্ষ নির্বাচনের বড় বাধা হতে পারে।

দক্ষিণপূর্ব: মেয়র নির্বাচনে কি কোনো রাজনৈতিক জোটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

এম এ মতিন:* না। মেয়র নির্বাচনে আমরা জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করতে চাই না। সামর্থ্য থাকলে এককভাবে নির্বাচন করবো। নয়ত মেয়র প্রার্থী দেব না। ১৯৯১ সাল থেকে আমরা নিজেদের আদর্শের ওপর ভর করে এককভাবে নির্বাচন করছি। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি বা বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করিনি। অন্য কোনো দলের সঙ্গেও জোটের ইতিহাস নেই। আমরা স্বতন্ত্র আদর্শ নিয়েই রাজনীতি করছি। ভবিষ্যতেও তা ধরে রাখতে চাই।  

ক্ষমতা আমাদের কাছে মুখ্য নয়। মূল লক্ষ্য হলো জনগণের সমর্থন যাচাই করা। মানুষ যদি আদর্শবান নেতৃত্বকে বেছে নেয়, তাহলে তারা আমাদের সমর্থন করবে। বিষয়টি জনগণের ওপর ছেড়ে দিতে চাই।

দক্ষিণপূর্ব: ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মূল লক্ষ্য কী?

এম এ মতিন: আমাদের লক্ষ্য হলো আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রেখে জনগণের কাছে যাওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ শেষ পর্যন্ত যোগ্য ও আদর্শবান নেতৃত্বকেই বেছে নেবে। আমরা যেনতেনভাবে ক্ষমতায় যেতে চাই না। মানুষের ভালোবাসা ও ভোটের মাধ্যমে দায়িত্ব পেলে তা গ্রহণ করব। কিন্তু ক্ষমতার জন্য আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার রাজনীতি করবো না।

দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।