পুরনো বছরের সব জরা ও গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়েছে ফুল বিজু। পাহাড়ি সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবির প্রথম দিনে কাপ্তাই হ্রদ, খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদী এবং সাংঙ্গু নদীসহ আশপাশের খাল ও ছড়ায় ফুল ভাসিয়ে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশে প্রার্থনার মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন তারা।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বাংলা নববর্ষ ‘পহেলা বৈশাখে’ একদিনে উদযাপিত হলেও পাহাড়ে বৈসাবি তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়। এই উৎসবকে ঘিরে পুরো এলাকায় বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ। এই আয়োজনের প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’। দিনটি উপলক্ষে আজ সকাল থেকেই বিভিন্ন পাড়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়।
চাকমা সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী, পুরোনো বছরের দুঃখ, গ্লানি ও পাপাচার থেকে মুক্তি পেতে দেবতার উদ্দেশে ফুল ভাসিয়ে পুরাতন বছরকে বিদায় জানানো হয়। এর মাধ্যমে নতুন বছর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে। তাই ফুল বিজুর দিন ভোরে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নদী ও খালে গিয়ে প্রার্থনার মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় জানান তারা।
বর্তমানে ফুল বিজু শুধু চাকমা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মারমা, ত্রিপুরা ও স্থানীয় বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেন। এতে উৎসবটি পেয়েছে সর্বজনীন রূপ।
ফুল ভাসানো শেষে তরুণ-তরুণীরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। নদীতে স্নান শেষে বাড়ি ফিরে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করেন এবং ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি নেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পল্লীতে গ্রামীণ খেলাধুলারও আয়োজন করা হয়।
চাকমা সমাজের যুব নেতারা জানান, গত বছরের মতো এবারও উৎসবটি উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। আগামী বছর এটি আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নদীতে ফুল দিতে আসা নুপুর চাকমা বলেন, তারা পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে ভোরে নদীর পাড়ে এসেছেন। গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল অর্পণ করবেন। তাদের প্রত্যাশা, অতীতের সব দুঃখ-অশান্তি দূর হয়ে নতুন বছরে শান্তি ফিরে আসবে।
অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সাধন কুমার চাকমা বলেন, ফুল বিজুর মধ্য দিয়েই চাকমা সম্প্রদায়ের মূল বিজু উৎসব শুরু হয়, যা চলবে আগামী ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময়জুড়ে নানা আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ষবরণ উদযাপন করা হবে।
আগামীকাল পালন করা হবে চাকমা সম্প্রদায়ের মূল বিজু। আর বাংলা নববর্ষের দিন উদযাপিত হবে ‘গজ্জাপজ্জা’, যা নতুন বছরের আনুষ্ঠানিক সূচনার অংশ হিসেবে বিবেচিত।
শুধু চাকমা সম্প্রদায় নয়, পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও চলছে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। ত্রিপুরা সম্প্রদায় চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করবে তিনদিনব্যাপী ‘বৈসু’ উৎসব। ‘হারিবৈসু’ দিনে নদীতে ফুল পূজা এবং শিশুদের অংশগ্রহণে রিনাই-রিসা ভাসানোর আয়োজন থাকবে। ঐতিহ্যবাহী ‘গরয়া নৃত্য’ এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
মারমা সম্প্রদায় পালন করবে ‘সাংগ্রাইং’ উৎসব। তিনদিনব্যাপী এ আয়োজনে থাকবে বুদ্ধ পূজা, বয়োজ্যেষ্ঠদের পবিত্র জল দিয়ে স্নান করানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় ‘রি-আকাজা’ বা পানি উৎসব, যেখানে সবাই একে অপরকে পানি ছিটিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
পার্বত্য অঞ্চলের এসব উৎসব শুধু আনন্দের নয়, বরং সম্প্রীতি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের সংস্কৃতি লালন করার পাশাপাশি পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দেন। বর্ষবরণকে ঘিরে পাহাড়জুড়ে এখন উৎসবের রঙ, গান, নৃত্য আর মানুষের মিলনমেলা, যেখানে নতুন বছরের স্বপ্নে ভরে উঠছে সবার মন।
এমএইচএফ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।