দক্ষিণ পূর্ব

বাবার হাত ধরে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন, ডেঙ্গুতে থেমে গেল ৭ বছরের অনুশ্রীর জীবন

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:১১ দুপুর
পঠিত : ২৮
বাবার হাত ধরে বাড়ি ফেরার স্বপ্ন, ডেঙ্গুতে থেমে গেল ৭ বছরের অনুশ্রীর জীবন

ছবি সংগৃহীত

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন 

হাসপাতালের আইসিইউতে শুয়ে ছিল সাত বছরের অনুশ্রী দাস। রাত তখন প্রায় ১টা। মেয়েকে দেখতে গিয়ে পাশে দাঁড়ান বাবা সুবল চন্দ্র দাস। বাবাকে দেখে ছোট্ট অনুশ্রী বলেছিল, ‘বাবা, আমি বাসায় যাব।’

মেয়ের সেই আকুতি হয়তো ছিল বাড়ি ফেরার স্বাভাবিক ইচ্ছা। কিন্তু সেটিই যে তার জীবনের শেষ কথা হয়ে থাকবে, তা জানতেন না বাবা।

শনিবার বিকেলে অনুশ্রী আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায় প্রথম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর জ্বর নিয়ে অসুস্থ হয়েছিল অনুশ্রী। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। শুরুতে পরিস্থিতি গুরুতর ছিল না। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে সে। কমে যায় খাওয়াদাওয়া। একপর্যায়ে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

তখন মেয়ের জন্য আইসিইউ বেড খুঁজতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে থাকেন সুবল। মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, সার্জিস্কোপ ও মা ও শিশু হাসপাতালে খোঁজ নেন। কোথাও বেড না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পাহাড়তলীর ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয় অনুশ্রীকে।

শুক্রবার দিবাগত রাত ১টার দিকে মেয়েকে আইসিইউতে দেখতে যান সুবল। তখন অনুশ্রীর প্লাটিলেটের মাত্রা নেমে এসেছিল সাড়ে ২৩ হাজারে। বাবাকে দেখেই বাড়ি ফেরার আকুতি জানায় সে।এরপর আর কথা বলেনি অনুশ্রী।

শনিবার সকালে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গুর প্রভাবে অনুশ্রীর লিভার ও কিডনিও আক্রান্ত হয়েছে। তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়ের জন্য প্রার্থনা চেয়ে সুবল লেখেন, ‘আমার অনুশ্রী লাইফ সাপোর্টে।’

দুই ঘণ্টা পরই আসে সেই খবর, যে খবর কোনো বাবা-মায়ের শোনার কথা নয়—‘আমার মেয়ে অনুশ্রী আর নেই।’

শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে হাসপাতালে মারা যায় অনুশ্রী। রাতে সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

অনুশ্রী ছিল পাহাড়তলীর রেলওয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই সন্তানের মধ্যে ছোট মেয়েটিকে ঘিরেই ছিল পরিবারের নানা স্বপ্ন।

অসুস্থ হওয়ার পর সেই স্বাভাবিক জীবনটাই যেন থেমে যায়।

সুবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, টানা দুই দিন কিছু খেতে পারেনি অনুশ্রী। যে মেয়ে বাবার হাত থেকে খেতে ভালোবাসত, অসুস্থতার কারণে সেই মেয়েকেই আর খাওয়াতে পারছিলেন না তিনি।

মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল অন্যরকম সময়। গত ২ আগস্ট পরিবারের সঙ্গে অনুশ্রীর সপ্তম জন্মদিন পালন করেছিলেন বাবা-মা। জন্মদিনের ছবি প্রকাশ করে মেয়েকে নিজের ‘বেঁচে থাকার প্রেরণা’ বলেছিলেন সুবল।

সেই মেয়েকেই শেষ বিদায়ের আগে নিজের হাতে সাজিয়ে দিতে হয়েছে তাকে।

মেয়েকে বাঁচানোর জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন সুবল। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছে অনুশ্রীর জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ চেয়েছিলেন। মুসলিম বন্ধুদের মসজিদে গিয়ে মেয়ের জন্য দোয়া করার অনুরোধও করেছিলেন।শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা থেমে যায়।

সুবল বলেন, ‘আমার মেয়ে চলে গেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য আমি সবকিছু করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি।’

অনুশ্রীর মৃত্যুর দিনে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের রোববারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ১১০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে।

নতুন আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৬ জন, বিআইটিআইডিতে ১৭ জন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ১১ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ২৪ জন এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২০ জন ভর্তি হয়েছেন।

নতুন একজনের মৃত্যু হওয়ায় চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ জনে।

আর / দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।