রফিক মোহাম্মদ
পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রায় ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হতে যাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় নির্মিত হচ্ছে এ সড়ক। তিন ধাপের এই কাজের মধ্যে প্রথম ধাপ শেষ হয়েছে ইতোমধ্যে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শেষ হলেই পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চলে তৈরি হবে অর্থনীতির শক্ত ভিত। এছাড়া যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটন, চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক পাচার, সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে এই সীমান্ত সড়ক। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড।
জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত সড়কটি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে শুরু হয়ে রাঙ্গামাটির রাজস্থলী উপজেলা সদর থেকে বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া থেকে জুরাইছড়ি উপজেলার দুমদুম্যা হয়ে মিয়ানমার ও ভারত সীমান্তে পৌঁছাবে। এ সড়কটি বরকল ও বাঘাইছড়ি এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা হয়ে রামগড় উপজেলা সীমান্তে গিয়ে শেষ হবে। পুরো রাস্তাটি সীমান্ত-সংলগ্ন পাহাড়ের ভেতর দিয়ে নির্মিত হচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সীমান্তবর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলা সংযুক্ত হবে। ২০৩৬ সালের মধ্যে ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার সড়ক কাজ শেষ হওয়ার কথা।
এরমধ্যে গত ৩০ জুন শেষ হয়েছে প্রথম ধাপের ৩১৭ কিলোমিটারের কাজ।এতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৪৮০ কোটি টাকা।পুরো কাজ শেষ হলে এটি হবে বাংলাদেশের দীর্ঘ সড়ক নেটওয়ার্ক। এই সড়ক ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সঙ্গে সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পথকে প্রশস্ত করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন সংশ্লিষ্টরা জানান, আয়তনে ক্ষুদ্র এবং আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটন স্পটের স্বল্পতার কারণে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ ট্যুরিজম সেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে না। যে কয়টি পর্যটন স্পট রয়েছে সেগুলোতে মানুষ যেতে যেতে অনাগ্রহী হয়ে উঠবে একসময়। এতে বাংলাদেশের মানুষ ভ্রমণের পিপাসা মেটাতে বিদেশমুখী হবে। এতে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশেই চলে যাবে। তাই পর্যটন খাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও অর্জন করতে বাংলাদেশে নতুন নতুন পর্যটন স্পট এক্সপ্লোরেশন করার বিকল্প নেই। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া দেশে এমন সম্ভাবনাময় স্থান খুবই অপ্রতুল। দূর্গমতার কারণে এই সম্ভাবনা ফিকে হয়েই রয়ে গেছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে নির্মানাধীন সীমান্ত সড়ক সে সুযোগের দ্বার উন্মোচন করেছে।
তারা আরও জানান, সীমান্ত সড়কের কারণে পাহাড়ে পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা দূর্গমতা ও অবকাঠামোর অভাবে পাহাড়ের যেসব অঞ্চলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন স্পট গড়ে ওঠেনি, সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে পাহাড়ে নতুন নতুন পর্যটন স্পট গড়ে উঠবে। খুব সহজেই দেশ ও বিদেশের পর্যটকরা সীমান্ত সড়ক ব্যবহার করে সেসকল পর্যটন স্পট ভ্রমণ করবে। পর্যটকেরা শুধু ভ্রমণ খাতে নয়, পাহাড়ে উৎপাদিত ফল, ফসল ও পণ্য ক্রয় করবে। এতে করে একদিকে যেমন পাহাড়ের নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমনি অর্থনীতিতে আসবে নতুন জোয়ার।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সীমান্ত সড়কের ফলে পাহাড়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায়ও বিপ্লবী পরিবর্তন আসবে। দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেসব অঞ্চলে আস্তানা গেঁড়েছিল, সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী খুব সহজেই এবং দ্রুত ওইসব অঞ্চলে পৌঁছাতে পারবে। ফলে সন্ত্রাসীদের পক্ষে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। একই সাথে দুর্গম এলাকার মানুষকে জিম্মি করে তারা যেভাবে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও নির্যাতন চালিয়ে আসছিল, দূর্গমতার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সাহস করতো না, এখন সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল ও যাতায়াতের ফলে মানুষের সাহস ও আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
ফলে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে সাহসী হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহলের ফলে চাঁদাবাজি, অপহরণ, নির্যাতন, সন্ত্রাসী কার্যক্রম হ্রাস পাবে। এতে করে স্থানীয় জনগণের জীবনে নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়াও সীমান্তে পুলিশ, বিজিবির পেট্রলিং সহজ হওয়ার কারণে আন্তঃসীমান্ত অস্ত্র চোরাচালান ও সন্ত্রাসীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে এই সড়ক নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ইতোমধ্যেই স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সীমান্ত সড়কের বিরোধিতা থেকে বোঝা যায়, এ সড়ক নেটওয়ার্ক তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাহাড়ী সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বা নির্দেশে পাহাড়ের সাধারণ কৃষকদের কিছু অংশ গাঁজা, পপির মতো মাদক চাষ করে থাকে। পর্যাপ্ত সড়ক যোগাযোগের অভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় এসবের খোঁজ পায় না। অভিযানও চালাতে পারে না। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন খুব সহজেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করতে পারবে। এ ছাড়াও গোল্ডেন ট্রায়াংঙ্গলের অংশ হিসেবে এ অঞ্চলে আন্তঃসীমান্ত মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়াও সীমান্তে পুলিশ, বিজিবির পেট্রোলিং সহজ হওয়ার কারণে আন্তঃসীমান্ত মাদক চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে এই সড়ক নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জানা যায়, সীমান্ত সড়ক শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে তাই নয়, বরং এটি আঞ্চলিক তথা বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ মিয়ানমার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এই সীমান্ত সড়কের ফলে রামগড়-সাবরুম, থেগামুখ স্থলবন্দর, ঘুমধুম-মংডু ও মিয়ানমারের চীন রাজ্যের সাথে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সুযোগ বৃদ্ধি করবে। সীমান্ত হাটগুলো কার্যকর হতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপকভাবে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
বান্দরবানের থানচি উপজেলার বাসিন্দা কৃষক ডায়মন্ড ম্রোং বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিয়ে যাওয়া যেতো না।এগুলো পঁচে নষ্ট হতো। বড় কোন অসুখ হল পরিবারের সদস্যদের হাসপাতালে নেয়া যেতো না।পড়াশোনার সুযোগ ছিলোনা। এখন সড়ক হওয়ার কারণে সবকিছু সহজ হবে। আর্মির করে দেয়া স্কুলে ছেলে মেয়েরা পড়াশোনাও করছে।এখন খুব ভালো লাগছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের আওতাধীন ১৭ ইসিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নুর মোহাম্মদ সেলিম বলেন, দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেসব অঞ্চলে আস্তানা গেঁড়েছিল, সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী খুব সহজেই এবং দ্রুত ওইসব অঞ্চলে পৌঁছাতে পারবে। ফলে সন্ত্রাসীদের পক্ষে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। একই সাথে দুর্গম এলাকার মানুষকে জিম্মি করে তারা যেভাবে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও নির্যাতন চালিয়ে আসছিল, দূর্গমতার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সাহস করতো না, এখন সীমান্ত সড়ক নির্মাণের ফলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল ও যাতায়াতের ফলে মানুষের সাহস ও আস্থা বৃদ্ধি পাবে। ফলে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে সাহসী হবে। তিনি বলেন, এই সড়কের ফলে রামগড়-সাবরুম, থেগামুখ স্থলবন্দর, ঘুমধুম-মংডু ও মিয়ানমারের চীন রাজ্যের সাথে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সুযোগ বৃদ্ধি করবে। সীমান্ত হাটগুলো কার্যকর হতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপকভাবে ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বৃদ্ধি পাবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, যেকোন অবকাঠামোগত উন্নয়ন মানে সমাজে রাষ্ট্র এগিয়ে যাওয়া।সেনাবাহিনীর দুর্গম পাহাড়ে করা এই সড়ক অনেকটা মহাযজ্ঞ বলা যায়। এতে পাহাড়ের অধীবাসীদের জীবনমান এগিয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে।
ইই
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।