সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিনের কাজ সেদিনই শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, মানুষের প্রত্যাশা ও সময়ের মূল্য বেড়েছে। তাই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি সেবার ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে।
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আপনার যে কাজ, সেই কাজটা আজকেই শেষ করা আপনার পবিত্র দায়িত্ব। কারণ, ওই চেয়ারে আপনি বসেছেন মানুষের কাজ করার জন্য। আজকের কাজ শেষ না করলে আজকের মানুষের চাহিদা পূরণ হবে না।’
মানুষের হাতে সময় কমে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একই কাজের জন্য বারবার সরকারি দপ্তরে আসার সুযোগ এখন মানুষের নেই। সময়মতো সেবা না পেলে মানুষ আগের চেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘মানুষের কাছে এখন সবকিছু থাকলেও একটি জিনিস নেই—সময়। একই কাজের জন্য সে বারবার সময় দেবে, সেই সুযোগ তার নেই।’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে জাহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে কেউ নেতিবাচক পরিচয় নিয়ে বিদায় নিতে চান না। মানুষের আস্থা ধরে রাখতে দায়িত্বশীলতা, দক্ষতা ও সময়মতো সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
নিজের কাজ নিয়ে প্রতিদিন আত্মমূল্যায়নের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—দায়িত্ব পালনে তিনি শতভাগ দিয়েছেন কি না এবং তাঁর আরও কিছু করার ছিল কি না।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘কোনো কাজ শেষ করতে না পারলে আপনার কি কখনো মনে হয়, এটা তো আমার কাজ ছিল, আমার করে যাওয়া উচিত ছিল? এই বোধটা আমাদের মধ্যে থাকতে হবে। তা না হলে সরকারের প্রত্যাশিত নাগরিকসেবা নিশ্চিত হবে না।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে কাজের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে কোনো ব্যক্তি বা পেশার নিজেকে অপরিহার্য ভাবার সুযোগ নেই। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা, চিন্তাভাবনা ও কর্মপদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
চীন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে একটি হোটেলে রোবটের মাধ্যমে কক্ষে সেবা পেয়েছিলেন। এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে প্রচলিত অনেক কাজের ধরন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পৃথিবী পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা নিজেদের কতটুকু পরিবর্তন করতে পারছি, আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধে পরিবর্তন আনতে পারছি কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রযুক্তি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি মানুষের মূল্যবোধের উন্নয়নও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও সমাজে লোভ, হিংসা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ও দেখা যাচ্ছে।
দেশ ও সমাজের প্রতি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এই জীবনে সমাজের জন্য আপনার অবদান কী? দেশের জন্য কী করেছেন? পরিবেশের জন্য কোনো অবদান আছে? মানুষ হিসেবে পৃথিবীর জন্য কী রেখে যাচ্ছেন—নিজেকে এসব প্রশ্ন করতে হবে।’
উন্নত রাষ্ট্র গড়তে নাগরিকদের চিন্তা ও মানসিকতারও উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা সবাই উন্নত রাষ্ট্র ও উন্নত সমাজব্যবস্থা চাই। কিন্তু আমার চিন্তাভাবনা ও মানসিকতা উন্নত কি না, সেটাও দেখতে হবে।’
সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিগুলো নির্ধারিত সময়ে স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চাপ বা ব্যবস্থা নেওয়ার আশঙ্কায় নয়, দায়িত্ববোধ থেকেই এসব কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের বেতন দেয় সরকার ও জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শতভাগ স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে হবে।’
সরকারি বরাদ্দের অর্থ অপচয় না করার বিষয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করেন তিনি।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শারীরিক সুস্থতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিজে সুস্থ না থাকলে সুস্থ চিন্তা করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য যথাযথভাবে কাজ করা কঠিন।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসন এখনো মানুষের আস্থার একটি জায়গা। সময়মতো সেবা, দায়িত্বশীলতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এই আস্থা আরও বাড়াতে হবে।
আর/ দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।