দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক
স্বল্প জামানতে মোটা অঙ্কের ঋণ এবং প্রতি মাসে জমানো টাকা দ্বিগুণ করার লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সাধারণ মানুষের প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়েছে ‘ফ্রেন্ডস অব ডিসাবেল সোসাইটি’ নামের একটি ভুয়া ও অনিবন্ধিত এনজিও। গ্রাহকদের টাকা নিয়ে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পালিয়ে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন প্রতারণার শিকার সহস্রাধিক নারী।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের মালঘর বাজার এলাকার একটি ভবনে এনজিওটির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যান প্রতারকরা।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে বিষয়টি জানাজানি হলে ভুক্তভোগীরা কার্যালয়টির সামনে ভিড় জমান। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং এনজিওটির রেখে যাওয়া আসবাবপত্র জব্দ করে কার্যালয়টি সিলগালা করে দেয়।
‘যেভাবে পাতা হয় প্রলোভনের ফাঁদ’
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংস্থাটি ১২০০ টাকার বিনিময়ে সদস্য ফরম পূরণ করাত। প্রতি মাসে ১২০০ টাকা জামানত রাখলে তা দ্বিগুণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। এ ছাড়া মাত্র ১০ হাজার টাকা জামানতে ১ লাখ টাকা এবং ২০ হাজার টাকা জামানতে ৩ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার আশ্বাসে প্রলোভন দেখানো হয়।
বিগত এক মাস ধরে ফিল্ড অফিসার মুশফিকুর রহমান ও ম্যানেজার মো. আলী নেওয়াজ খানের নেতৃত্বে মাঠকর্মীরা উপজেলার হাইলধর, বারখাইন, বরুমছড়া ও রায়পুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগঞ্জে ঘুরে সাধারণ নারী ও পোশাক শ্রমিকদের ফাঁদে ফেলেন। ১ লাখ থেকে শুরু করে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তারা প্রায় এক হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে আনুমানিক এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। বৃহস্পতিবার ঋণের টাকা দেওয়ার কথা বলে সবাইকে কার্যালয়ে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু গ্রাহকরা সেখানে গিয়ে দেখেন কার্যালয়ে তালা ঝুলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর মালঘর বাজার এলাকার মো. নুরুল কবিরের ভবনের একটি তলা প্রতি মাসে ১৩ হাজার টাকা ভাড়ায় নেন এনজিওটির ম্যানেজার মো. আলী নেওয়াজ খান। চুক্তিপত্রের জন্য কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন ব্যক্তির পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়। ১ অক্টোবর চুক্তিপত্র স্বাক্ষর হওয়ার কথা থাকলেও ৩০ সেপ্টেম্বর রাতেই তারা সব টাকা নিয়ে পালিয়ে যান।
প্রতারণার শিকার রায়পুর গহিরা এলাকার পোশাক শ্রমিক মোছাম্মৎ রুমি আকতার বলেন, ‘মনির নামের এক মাঠকর্মীর মাধ্যমে ১২০০ টাকা দিয়ে সদস্য হই। ২ বছর মেয়াদে ঘর বানানোর জন্য ৩ লাখ টাকা ঋণ দেবে বলে রোববার আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা জমা নেয়। বৃহস্পতিবার ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসে দেখি তারা কার্যালয়ে তালা দিয়ে পালিয়েছে। তাদের সব ফোনও বন্ধ।’
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কামরুনাহার, আবু ছালেহ, শাহাদাত হোসেন, জেসমিন আক্তার, ফরিদা বেগম, সুলতানা আক্তারসহ একাধিক ভুক্তভোগী একই ধরনের অভিযোগ জানান।
ভবন মালিক মো. নুরুল কবির জানান, ‘চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করার আগেই ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে তারা পালিয়ে যায়। পরদিন ভুক্তভোগীরা এসে ভিড় করলে বিষয়টি বুঝতে পারি। পরে পুলিশ এসে তাদের সাইনবোর্ড খুলে নেয়। এ ঘটনায় আমি থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’
তিনি আরও জানান, এর আগেও একই ভবনে লটারির প্রলোভন দেখিয়ে অন্য একটি প্রতারক চক্র মানুষের টাকা হাতিয়ে পালিয়েছিল।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. ফয়েজ খান বলেন, ‘ভুক্তভোগী নারীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি কার্যালয়ে তালা ঝুলছে এবং তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রশাসনের আইনি সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েদ চৌধুরী জানান, ‘ভবনমালিক থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রতারক চক্রটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ফ্রেন্ডস অব ডিসাবেল সোসাইটি,
দক্ষিণপূর্ব/এসএস
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।