দক্ষিণ পূর্ব

‘আমার বাপ বুকটা ভইরা গেছিল, হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে’

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৫ অক্টোবর ২০২৬ ০১:০৩ দুপুর
পঠিত : ৩১
‘আমার বাপ বুকটা ভইরা গেছিল, হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে’

পুলিশ কনস্টেবল আল আমিন

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন 

‘আমার বাবায় পুলিশ অইছিল, আমার বাপ বুকটা ভইরা গেছিল। আমার হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে রে! আমার বাবায় জানি কত কষ্ট পাইয়া মরছে।’—ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন চট্টগ্রামের ওয়াসা মোড়ে বাসের ধাক্কায় নিহত পুলিশ কনস্টেবল আল আমিন সরদারের মা সেলিনা বেগম।

রোববার (৪ অক্টোবর) সকালে নগরীর ওয়াসা মোড়ের ইস্পাহানি চেকপোস্ট এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে তিন যুবককে থামানোর চেষ্টা করছিল পুলিশ। এ সময় একজন পালিয়ে গেলে তাকে আটকাতে মোটরসাইকেল নিয়ে এগিয়ে যান কনস্টেবল আল আমিন। তখন পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি বাস তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর সোমবার (৫ অক্টোবর) ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

নিহত আল আমিন সরদার মাদারীপুর সদর উপজেলার উত্তর দুধখালী গ্রামের আব্দুল হক সরদারের ছেলে। ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেওয়া আল আমিন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ অর্ডার ম্যানেজমেন্ট শাখায় কর্মরত ছিলেন এবং কোতোয়ালী থানায় সংযুক্ত ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে বিবাহিত আল আমিনের আড়াই মাস বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদের সামনে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন আল আমিনসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য। সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করা তিন যুবককে দেখে পুলিশ সদস্যরা তাদের থামার সংকেত দেন। একপর্যায়ে তাদের একজন পালানোর চেষ্টা করলে চেকপোস্টের ইনচার্জ এএসআই হিরণ মিয়া তাকে ধাওয়া করেন।

আল আমিনও মোটরসাইকেল নিয়ে অন্য দিক থেকে ওই যুবককে আটকানোর চেষ্টা করেন। তিনি মসজিদের পশ্চিম ফটকের দিকে এগিয়ে গেলে পেছন থেকে লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের একটি দ্রুতগতির বাস এসে তার মোটরসাইকেলে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর বাসটি তাকে প্রায় ৫০ থেকে ১০০ গজ সড়কে টেনে নিয়ে যায়।

পরে সহকর্মীরা স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার ভোরে তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় বাসচালক মোশাররফ (৩৮) ও স্টাফ জয় দাসকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটিও জব্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আল আমিনের বাবা আব্দুল হক সরদার বলেন, ‘কয়দিন আগে ছুটিতে আইছিল আলামিন। শুক্রবার জুমার পরে আমার সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম। আমি তো বুঝি নাই যে এইডাই আমার বাবার সঙ্গে আমার শেষ ছবি। আমার সাত সন্তানের মধ্যে আমার আলামিন ছিল সবচেয়ে নম্র-ভদ্র।’

একমাত্র ভাইকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বোন হালিমাও। তিনি বলেন, ‘আমার একটা ভাই পুলিশ হইছে, আমরা যে কত গর্ব করছি। আল্লাহ যে আমার ভাইরে এত তাড়াতাড়ি নিয়্যা যাইব, আমরা তো তা জানতাম না।’

স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা আল আমিনের স্ত্রী ইশরাত জাহান রিয়া। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমি এখন কীভাবে বেঁচে থাকব? আমার আড়াই মাসের মেয়ে নিয়ে কার দুয়ারে যাব? আমার মেয়ে কাকে বাবা বলে ডাকবে? আল্লাহ, তুমি আমারে এত অল্প বয়সে কী করলা?’

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে মা সেলিনা বেগমের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। ছেলেকে হারিয়ে তিনি বারবার বলছিলেন, ‘আমার বাবায় পুলিশ অইছিল, আমার বাপ বুকটা ভইরা গেছিল। আমার হেই বুকটা এহন খালি অইয়া গেছে রে!’

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহেদুল কবির বলেন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আল আমিনের মৃত্যু হয়েছে। তার মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন হয়েছে। আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।

সিএমপি জানিয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে আল আমিনের মৃত্যুতে পুলিশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।

সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হাবিবুর রহমান প্রামাণিক বলেন, দায়িত্ব পালনকালে ওই পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হওয়ায় আইন অনুযায়ী তার পরিবার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাবে।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আল আমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়নি। সোমবার রাত ১০টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা রয়েছে।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।