উপকরণের দাম বেড়েছে, বেড়েছে শ্রমিকদের মজুরিও। কিন্তু বাড়েনি দুর্গাপ্রতিমার দাম। ফলে শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ব্যস্ততা বাড়লেও স্বস্তি নেই চট্টগ্রামের মৃৎশিল্পীদের। বাড়তি উৎপাদন খরচের চাপ সামলে পুরোনো দরেই প্রতিমা তৈরি করতে হচ্ছে তাঁদের। কেউ কেউ প্রতিমাপ্রতি ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন। আবার একটি প্রতিমা বিক্রি করে পাওয়া অর্থের বড় অংশই চলে যাচ্ছে নির্মাণ খরচে। তবু পূর্বপুরুষের পেশা, শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে কম লাভেই কাজ করছেন তাঁরা।
আর মাত্র কয়েক দিন পর শারদীয় দুর্গোৎসব। শনিবার মহালয়া উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবীপক্ষের ক্ষণগণনা। উৎসবকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন মন্দির-মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও বাঁশের কাঠামো তৈরি, কোথাও খড় দিয়ে প্রতিমার অবয়ব গড়া, আবার কোথাও চলছে মাটির প্রলেপ ও রং-তুলির কাজ। দেবী দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ, কার্তিক ও মহিষাসুরের প্রতিমা তৈরিতে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগরেরা।
নগরীর সদরঘাট, দেওয়ানজী পুকুরপাড়, এনায়েতবাজার-গোয়ালপাড়া, চট্টেশ্বরী রোড, হাজারী লেন, পাথরঘাটা ও নালাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার প্রতিমাশালায় এখন কর্মব্যস্ততা। একই চিত্র চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, বাঁশখালীসহ জেলার ১৫ উপজেলায়। তবে উৎসবের এই কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে রয়েছে মৃৎশিল্পীদের বাড়তি ব্যয়, সীমিত আয় আর পেশা টিকিয়ে রাখার কঠিন বাস্তবতা।
শিল্পীদের ভাষ্য, একসময় দুর্গাপূজার মৌসুম ছিল বাড়তি আয়ের বড় সুযোগ। এখন উপকরণের দাম ও শ্রমিকদের মজুরি বাড়লেও প্রতিমার মূল্য সেভাবে বাড়ছে না। অনেক পূজা কমিটি আগের বাজেটেই প্রতিমা তৈরি করতে চায়। ফলে খরচের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রাম মহানগরে ২৯৪টি এবং জেলার ১৫ উপজেলায় ২ হাজার ২৭৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে মণ্ডপের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬৮টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৬৫৫টিতে প্রতিমা পূজা এবং ৬১৯টিতে ঘট পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পূজা বেড়েছে ৭২টি এবং মহানগরে বেড়েছে দুটি।
পরিষদের তালিকা অনুযায়ী, দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় মোট ১ হাজার ৩৯৬টি পূজার আয়োজন রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিমা পূজা ৭৯৬টি এবং ঘট পূজা ৬০০টি। অন্যদিকে উত্তর চট্টগ্রামের সাত উপজেলায় ৮৭৮টি পূজা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতিমা পূজা ৮৫৯টি এবং ঘট পূজা ১৯টি।
নগরীর কাতালগঞ্জের শ্রী শ্রী রাধা মাধব আখড়ায় প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত ফেনীর ফুলগাজীর মৃৎশিল্পী স্বদেশ সাহা। গত বছরের তুলনায় এবার কমসংখ্যক প্রতিমার কাজ নিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে তৈরি করছেন ২২টি প্রতিমা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে নয়টি এবং খাগড়াছড়িতে একটি প্রতিমার কাজ করছেন তিনি।
স্বদেশ সাহা বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় সব ধরনের উপকরণের দাম বেড়েছে। কিন্তু পূজা কমিটিগুলোর বাজেট সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে খুব সামান্য লাভ রেখেই কাজ করতে হচ্ছে।
একই শিল্পালয়ে প্রতিমা তৈরি করছেন রিপন পাল। সাত বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত তিনি। রিপন জানান, প্রতিমাপ্রতি নির্মাণ ব্যয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কিন্তু প্রতিমার দাম তেমন বাড়েনি। আগে যে নকশা ও বাজেটে প্রতিমা তৈরি করা হতো, এখনো অনেক পূজা কমিটি সেই বাজেটেই কাজ শেষ করতে চায়।
রিপন পাল বলেন, লাভ কম হলেও দেবী দুর্গার প্রতি ভালোবাসা এবং পেশার প্রতি টান থেকেই কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।
নগরীর হাজারী লেনের উত্তম পালের শিল্পালয়ের প্রধান কারিগর টিটু কুমার পাল প্রায় ছয় বছর ধরে প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। সীতাকুণ্ডের এই মৃৎশিল্পী জানান, বৈশাখ মাস থেকেই শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন তাঁরা। এবার তাঁদের শিল্পালয়ে ১৪টি প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া পাঁচটি স্থায়ী পূজামণ্ডপ ও খাগড়াছড়িতেও কাজ করছেন তাঁরা।
টিটু কুমার পাল বলেন, পূজা যত ঘনিয়ে আসছে, কাজের চাপও তত বাড়ছে। তাঁকে নিয়ে আটজন কারিগর দিনরাত কাজ করছেন। আগের তুলনায় নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়েছে, অথচ প্রতিমার দাম বাড়েনি সেই অনুপাতে। তাঁদের শিল্পালয়ে সর্বনিম্ন ৩০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যের প্রতিমা তৈরির কাজ পাওয়া গেছে।
তাঁর ভাষ্য, প্রতিমা তৈরি শুধু উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি একটি শিল্প। পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সদরঘাট কালীমন্দির এলাকার একটি শিল্পালয়ের কারিগর মিলন পালও একই সমস্যার কথা জানান। তিনি বলেন, উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও শিল্পীদের মজুরি কিংবা প্রতিমার মূল্য প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। ফলে পূজার মৌসুমে কাজের চাপ বাড়লেও বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকছে না।
শ্রী শ্রী রাধা মাধব আখড়ার স্বত্বাধিকারী তাপস পাল জানান, প্রতিমা তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়েছে। গত বছর যে মাটির বস্তা ৩৫০ টাকায় কেনা যেত, এবার সেটির দাম পড়ছে ৫০০ টাকা। কর্ণফুলী থেকে চকবাজারে মাটি পরিবহনের খরচও বেড়েছে ১ হাজার টাকা। পাটের দাম ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার টাকা। ৬০০ টাকার খড়ের নাড়া কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। চটের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০০ টাকায়। এর বাইরে বাঁশসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে।
তাপস পাল বলেন, তাঁর শিল্পালয়ে নয়জন শ্রমিক প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত রয়েছেন। উপকরণের পাশাপাশি শ্রমিকদের মজুরিও বেড়েছে। ফলে একটি প্রতিমা তৈরিতে পাওয়া অর্থের বড় অংশই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে নির্মাণকাজে।
তিনি জানান, একটি প্রতিমার জন্য এক লাখ টাকা পাওয়া গেলে প্রায় ৯০ হাজার টাকাই খরচ হয়ে যায় নির্মাণে। এর বাইরে যাতায়াত ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় রয়েছে। সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ থাকে খুব সামান্য।
তাপস পাল বলেন, পূর্বপুরুষেরা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের ধারাবাহিকতায় তাঁরাও প্রতিমা তৈরি করছেন। কিন্তু যেভাবে উপকরণের দাম বাড়ছে, তাতে এ পেশা ধরে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
হাজারী লেনের উত্তম পালও জানান, নির্মাণ ব্যয় বাড়লেও পূজা ও মণ্ডপ কমিটিগুলো প্রতিমার জন্য বরাদ্দ বাড়ায়নি। নির্ধারিত বাজেটের মধ্যে কাজ শেষ করতে গিয়ে বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে তাঁদের। তারপরও পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিল্পের প্রতি ভালোবাসা তাঁদের এই পেশায় টিকিয়ে রেখেছে।
প্রতিমা তৈরির পাশাপাশি দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন ও পূজা উদ্যাপন পরিষদ। চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার নাথ বলেন, দুর্গোৎসব স্বতঃস্ফূর্তভাবে উদ্যাপনে তাঁরা প্রশাসনের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা প্রত্যাশা করছেন। মণ্ডপের নিরাপত্তায় পুলিশ যথেষ্ট সহযোগিতা করছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, মহানগরের বাইরে জেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ২ হাজার ২৮৭টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। কোনো গুজব ছড়ালে দ্রুত প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও মুঠোফোন নম্বর সংশ্লিষ্ট থানায় জমা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের সহজে শনাক্ত করতে নির্দিষ্ট পোশাক বা আর্মব্যান্ড ব্যবহারের নির্দেশনাও রয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের কাজ সূর্যাস্তের আগেই শেষ করা এবং বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, দুর্গাপূজায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশেষ টিম কাজ করবে। বিসর্জনের সময় যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হবে। বিসর্জনে ব্যবহৃত যানবাহনের ফিটনেস ও চালকের শারীরিক সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা তৈরি ও পরিবহন থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো গোষ্ঠী যাতে গুজব বা অপপ্রচার ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ ধরনের অপতৎপরতা শনাক্তে জেলা প্রশাসনের সাইবার ইউনিট কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরতে প্রশাসন ও পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
জে আর/দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।