দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে দেওয়ার চুক্তি হতে যাচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা। চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালনা করবে। টার্মিনাল ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায় করবে প্রতিষ্ঠানটি। বিনিময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন অর্থের পাশাপাশি কনটেইনারপ্রতি মাশুল দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির আর্থিক ও অন্যান্য বিস্তারিত শর্ত এখনো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
এনসিটি ইজারার প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শুরু হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তা গতি পায়। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থগিত থাকা প্রক্রিয়া আবার এগিয়ে নেওয়া হয়।
গত ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করে। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায়ের মাধ্যমে এনসিটি হস্তান্তরসংক্রান্ত আইনি জটিলতার অবসান হয়।
২০০৮ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে বিশ্বের চারটি শীর্ষ বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হয়। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের পিঅ্যান্ডও ছিল, যেটি পরে ডিপি ওয়ার্ল্ড অধিগ্রহণ করে। তবে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ওই নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায়।
এরপর এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া নতুন করে শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে দুবাই সরকার ও বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের (পিপিপি কর্তৃপক্ষ) মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের মাধ্যমে ইজারা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ওই সময়ে এনসিটি ইজারার প্রক্রিয়া গতি পায়। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের পর শুরু হয় দর-কষাকষি। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি চলে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চুক্তির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। গত ৮ ফেব্রুয়ারি পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরী জানিয়েছিলেন, খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড আরও সময় চেয়েছে।
পরে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবের কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে দর-কষাকষি চূড়ান্ত করা হয়।
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আসছেন বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। তাদের দাবি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, বন্দরের স্বার্থ ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে সমাবেশ শেষে মশাল মিছিল করেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। কর্মসূচিতে এনসিটি দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার দাবি জানানো হয়।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, এনসিটি বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে বন্দরের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। দাবি আদায় না হলে ধারাবাহিক আন্দোলনের পাশাপাশি আরও কঠোর কর্মসূচিরও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
গত সোমবার এক অবস্থান কর্মসূচিতেও আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এদিকে আন্দোলনকারীরা আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বন্দর ভবনের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা চুক্তির আর্থিক শর্ত ও দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো প্রকাশ না করায় প্রশ্ন তুলেছেন। বুধবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, চুক্তির আর্থিক শর্ত ও দায়বদ্ধতার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, জনমত ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামত বিবেচনা না করে চুক্তি করা হলে এর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এনসিটিতে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। নির্মাণের পর প্রথমে আংশিক এবং পরে পূর্ণাঙ্গভাবে টার্মিনালটি চালু হয়। এতদিন দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এটি পরিচালিত হয়ে আসছিল।
এনসিটিতে মূলত জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার তোলা এবং জাহাজ থেকে আমদানি কনটেইনার নামানোর কাজ হয়।
গত অর্থবছরে এই টার্মিনালে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানামা করেছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য জাফর আলমের মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নিলে এনসিটির সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তার ভাষ্য, ডিপি ওয়ার্ল্ড এর আগে অবকাঠামো খাতে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছিল।
তিনি মনে করেন, এনসিটির পাশাপাশি বন্দর থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়ার পথেও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে উৎপাদন অঞ্চলের কাছে প্রস্তাবিত ধীরাশ্রম অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) এবং এর সঙ্গে রেল যোগাযোগে বিনিয়োগ করা হলে পরিচালনদক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেও সুফল আসতে পারে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির দায়িত্ব নিলে এটি হবে বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়া চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল।
এর আগে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি)। আর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে লালদিয়ায় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য নিয়োগ পেয়েছে ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস। এছাড়া পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল সুইজারল্যান্ডের মেডলগের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের দুটি টার্মিনাল এখনো দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
আর /দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।