চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ওভারফ্লো ইয়ার্ডসহ কনসেশন চুক্তির আওতায় ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম।
বৃহস্পতিবার এক যৌথ বিবৃতিতে কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার ও সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টু এ ক্ষোভ জানান।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এ বিষয়টি মূল এজেন্ডায় না রেখে ‘বিবিধ’ এজেন্ডার মাধ্যমে উত্থাপন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। জাতীয় সম্পদ ও কৌশলগত বন্দর অবকাঠামোর বিষয়ে কেন বিষয়টি মূল এজেন্ডায় বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হয়নি, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন তারা।
তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি ও জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ফলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তকে শুধু বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজস্ব, কর্মসংস্থান, বন্দর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা, কৌশলগত নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ জড়িত।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তির মাধ্যমে শুধু টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বই দেওয়া হয় না; চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরিচালনা, রাজস্ব, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তেও দীর্ঘ সময়ের জন্য বেসরকারি বা বিদেশি অপারেটরের প্রভাব তৈরি হতে পারে। তাই চুক্তির প্রতিটি ধারা, আর্থিক কাঠামো, রাজস্ব ভাগাভাগি, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, ঝুঁকি বণ্টন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার শর্ত জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি জানান তারা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এনসিটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছে। এ অবস্থায় ১৫ বছরের জন্য কনসেশনে দেওয়ার আগে রাষ্ট্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালটির সক্ষমতা ও আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা যাচাই করেছে কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কনসেশন থেকে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা এবং নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করলে সম্ভাব্য আয়ের তুলনামূলক হিসাবও প্রকাশ করতে হবে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বা প্রযুক্তির বিরোধিতা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে জাতীয় কৌশলগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো চুক্তির ফলে রাষ্ট্রের রাজস্ব, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ, কর্মসংস্থান কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু চট্টগ্রামের সম্পদ নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এ বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। তাই বন্দরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনের আওতায় দেওয়ার প্রভাব বর্তমান সরকারের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর সময়েও থাকবে।
বন্দর রক্ষা কমিটি এনসিটি কনসেশন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ খসড়া ও আর্থিক কাঠামো প্রকাশ, স্বাধীন অর্থনৈতিক ও কারিগরি মূল্যায়ন, শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ও অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের নিশ্চয়তা দাবি করেছে।
একই সঙ্গে এনসিটি পরিচালনায় দেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থাপনা কাঠামো বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
নেতৃবৃন্দ বলেন, তাদের অবস্থান কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের বিরুদ্ধে নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বন্দর ব্যবহারকারী, শ্রমিক-কর্মচারী এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের পক্ষে।
তারা অবিলম্বে এনসিটি কনসেশন চুক্তির সিদ্ধান্ত বাতিল, চুক্তির সব শর্ত জনসম্মুখে প্রকাশ এবং জাতীয় স্বার্থের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন ছাড়া কোনো চূড়ান্ত চুক্তি না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দাবি পূরণ না হলে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
আর / দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।