মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
একসময় ১০০ টাকায় এক কেজি মাল্টা পাওয়া গেলেও এখন একই দামে মিলছে না একটি মাঝারি আকারের ফলও। চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে মাল্টার দাম এখন কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে মাল্টা কিনতে আসা মনির হোসেন একটি মাঝারি আকারের মাল্টা ওজন করেন। ফলটির ওজন হয় ২৩৫ গ্রাম। কেজিপ্রতি ৫২০ টাকা হিসাবে এর দাম দাঁড়ায় ১২২ টাকা ২০ পয়সা। একটি মাল্টার দাম শত টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বিস্মিত হন তিনি।
মনির হোসেন বলেন, ২০২০ সালে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল ১০০ টাকার আশপাশে। ছয় বছরের ব্যবধানে সাধারণ একটি ফলের দাম এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম নগরের বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি মাল্টা ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হতো। ওই মাসের শেষ দিকে রোজা শুরু হলে দাম এক লাফে ১৮০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। পরে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের পর ব্যবসায়ীরা আবার ১০০ টাকা কেজি দরে মাল্টা বিক্রি শুরু করেন।
করোনার পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আমদানি করা এ ফলের দাম। গত বছরের আগস্টে মাল্টার দাম কেজিপ্রতি ৪৪০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। সেটিই এতদিন সর্বোচ্চ দাম ছিল। এবার সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগেও চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে মানভেদে ৩৩০ থেকে ৩৬০ টাকা কেজি দরে মাল্টা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে ৫০০ থেকে ৫২০ টাকায় ঠেকেছে। পাইকারি বাজারেও প্রতি কেজি মাল্টার দাম প্রায় ৪৫০ টাকা।
চট্টগ্রামের প্রধান পাইকারি ফলের বাজার ফলমন্ডিতে গতকাল ১৫ কেজির এক কার্টন মাল্টা ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। পরিবহন, শ্রমিক খরচ ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করে খুচরা বাজারে সেই মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা কেজি দরে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশ থেকে ৩৮ ধরনের বিদেশি ফল আমদানি হয়। এর মধ্যে অন্যতম মাল্টা। মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি মাল্টা আসে। এ ছাড়া চীন, ভুটান, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ড থেকেও ফলটি আমদানি করা হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে দেশে ২৩ হাজার ৭১৭ টন মাল্টা, আপেল, কমলা ও আঙুর আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ১৮৬ টনে। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই আমদানি হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার টন ফল।
২০২৫-২৬ অর্থবছরেও মাল্টা ও কমলা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ওই অর্থবছরে এ দুটি ফল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৯৫ টন। আগের অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৭০ টন। অর্থাৎ এক বছরে আমদানি বেড়েছে ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ। গত চার অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ আমদানি।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে মাল্টা ও কমলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৬৮৭ টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
আমদানিকারকদের মতে, বর্তমান সরবরাহ সংকটের অন্যতম কারণ আগের সময়ের লোকসান। অতিরিক্ত আমদানির কারণে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় তখন মাল্টার দাম কমে যায়। এতে আমদানিকারকরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। এরপর অনেক আমদানিকারক আমদানি কমিয়ে দেন।
ফল আমদানিকারক রবিউল আলম ফারুক বলেন, এর আগে বাজারের চাহিদার তুলনায় বেশি মাল্টা আমদানি করা হয়েছিল। এতে দাম কমে গিয়ে আমদানিকারকদের বড় অঙ্কের লোকসান হয়।
তিনি বলেন, জুলাইয়ে প্রতি কনটেইনারে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা এবং আগস্টে প্রায় ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। এ কারণে আগস্ট থেকে অনেক আমদানিকারক বড় পরিমাণে মাল্টা আমদানি কমিয়ে দেন বা বন্ধ রাখেন। এর প্রভাব পড়ে সেপ্টেম্বরের সরবরাহে।
আমদানিকারকরা জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরে জাহাজের জটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সাধারণত ডারবান থেকে চট্টগ্রামে একটি চালান পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। কিন্তু বর্তমানে বন্দরে প্রবেশ ও পণ্য ওঠানোর ক্ষেত্রে জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটে খুচরা বিক্রেতা ফারুক বলেন, হাসপাতালগুলোর আশপাশে মাল্টার সরবরাহ সংকট সবচেয়ে বেশি। কাজীর দেউড়ি বাজারে মাল্টা ও কমলা কেজিপ্রতি ৫৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এত বেশি দামে মানুষ ফল কিনতে পারছেন না। ফলে বেচাবিক্রিও কমে গেছে।
ফল বিক্রেতা আবদুল হালিম বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে ক্রেতাদের মধ্যে ফল কেনার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
হাসপাতালের কাছে আরেক বিক্রেতা মোহাম্মদ শাহীন বলেন, কয়েক দিন ধরে মাল্টা পাওয়া যাচ্ছিল না। আগে যারা অল্প পরিমাণে মাল্টা কিনতেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় তারাও এখন কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।
ফল আমদানিকারক গনি চৌধুরী বলেন, নতুন চালান বাজারে প্রবেশ করলে মাল্টার দাম কমে আসতে পারে। তবে বর্তমানে বেশি দামে কেনা মাল্টা পরে কম দামে বিক্রি করতে হলে মজুতদার ব্যবসায়ীদের লোকসানে পড়তে হতে পারে।
চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ফলমন্ডির মেসার্স আখি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ তৌহিদুল আলমের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিরও ফল আমদানিতে প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে পরিবর্তন এসেছে। অনেক জাহাজ ভিন্ন রুটে গিয়ে আটকে আছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা মাল্টাবাহী জাহাজগুলো শ্রীলঙ্কার দিকে আটকে থাকায় সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।