দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি থেকে আটক কে সেই ভারতীয় নাগরিক

দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০২৬
পঠিত :
চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি থেকে আটক কে সেই ভারতীয় নাগরিক

ছবি

রাষ্ট্রপতির সফরকে ঘিরে তখন চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ নেভাল একাডেমীতে রাষ্ট্রপতির রাত্রিযাপনের কারণে টহল জোরদার করেছিল র‍্যাবসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী। ঠিক সেই সময়, গভীর রাতে নেভাল একাডেমীর প্যারিমিটার সংলগ্ন এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যায় এক যুবককে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাকে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। পরে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ভারতের নাগরিক।

 

তার কাছে ছিল না কোনো বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা। অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা হয়, কারাগারেও যেতে হয় তাকে। কিন্তু ১০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও স্পর্শকাতর ওই সামরিক স্থাপনার পাশে তিনি কেন ছিলেন, কী উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও। মামলার নথি, আদালতের কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে রহস্যে ঘেরা সেই ঘটনার অজানা কিছু তথ্য।

 

তৎকালীন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ওই ব্যক্তিকে ঘিরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহও উঠেছিল। যদিও এ বিষয়ে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের নথিতে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে সাজা শেষ হওয়ার পরও শতাধিক ভারতীয় নাগরিক আটকে থাকার তথ্য সামনে আসার পর পুরোনো এই ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

 

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাত দুইটার দিকে। সেদিন চট্টগ্রাম নৌ অঞ্চলে রাষ্ট্রপতি আব্দুর হামিদ সফর উপলক্ষে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ নেভাল একাডেমীতে রাত্রিযাপনের কর্মসূচি থাকায় র‍্যাব ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী এলাকাজুড়ে বিশেষ টহল চালাচ্ছিল। এ সময় পতেঙ্গা থানার বাংলাদেশ নেভাল একাডেমীর উত্তর পাশের প্যারিমিটার সংলগ্ন এলাকায় এক ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। টহল দল তাকে থামতে বললে তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

 

এজাহারে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তির কথাবার্তায় অসংলগ্নতা ছিল। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি নিজের নাম ছনু মিয়া (২০) বলে জানান। তবে কারাগারে নথিতে তার নাম ছনু আলী। তার বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার করিমনগরের বানুপুর এলাকায়। তবে বাংলাদেশে প্রবেশের কোনো বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা অনুমতিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

 

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, নেভাল একাডেমীর মতো স্পর্শকাতর স্থাপনার কাছে তার অবস্থানের কারণ উদঘাটন এবং তার দেওয়া তথ্য যাচাই করতে বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল। এ কারণেই মামলা দায়েরে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

 

ঘটনাটি নিয়ে সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেও কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। কারণ রাষ্ট্রপতির সফর চলাকালে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকা একটি সামরিক স্থাপনার কাছে একজন বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল বা ওই ব্যক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

 

পরে তার বিরুদ্ধে দ্য কন্ট্রোল অব এন্ট্রি অ্যাক্ট, ১৯৫২ (প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ আইন)-এর ৪ ধারায় মামলা করা হয়। মামলায় বলা হয়, তিনি বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা ছাড়া বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন এবং একটি স্পর্শকাতর স্থাপনার কাছে সন্দেহজনকভাবে অবস্থান করছিলেন। একই সময়ে বন্দরের আশপাশ থেকে আরও একজন ভারতীয় নাগরিককে আটক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তবে সেটি প্রকাশ্যে আসেনি।

 

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বক্তব্য ছিল অসংলগ্ন। তারা কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, কোথায় অবস্থান করছিলেন এবং কেন ওই এলাকায় ঘোরাঘুরি করছিলেন-এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তখনই তাদের পরিচয় নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে তদন্তের শেষ পর্যন্ত কোনো গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।

 

দূতাবাসের নীরবতা: 

 

মামলাটির আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী জিয়া আহসান হাবীব বলেন, ভারতীয় নাগরিকদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের জন্য ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল।

 

তিনি বলেন, তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ভারতীয় এম্বাসিকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমার জানা মতে, দূতাবাস প্রয়োজনীয় ট্রাভেল পাস বা নথি দেয়নি এখনো। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক সাড়া না পাওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছিল।

 

চট্টগ্রাম আদালত সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে আদালতে তোলা হলে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়। সাজা শেষ হলেও ভারত তাকে নিয়ে যাচ্ছে না। ফলে তিনি এখনো জেলেই আছেন। এই ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তারাও তার প্রকৃত রহস্য বের করেনি। কারণ ভারতীয় একজন নাগরিক কীভাবে চট্টগ্রাম পর্যন্ত আসলো। রাষ্ট্রপতি যেখানে থাকবেন সেখানে কীভাবে ঢুকলো তা আর বের করেনি তৎকালীন আ.লীগ সরকার।  

 

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ শরীফ বলেন, একবছর সাজা শেষ হলেও তাকে নিতে কেউ আসছে না। সেজন্য ২০১৭ সাল থেকে এখনো জেলে আছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকেও কোনো নির্দেশনা আসেনি।

 

সরকারি হিসাবে ছনু মিয়ার পেছনে ব্যয় লক্ষাধিক টাকা

 

ছনু মিয়া ২০১৬ সালে কারাগারে আসেন। সাজা শেষ হয় ২০১৭ সালে। ২০২৫ সাল পেরিয়ে এখনো সেখানেই পড়ে আছেন। সাজার মেয়াদ কবেই শেষ হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় এই নাগরিককে নিতে কেউ আসেনি। দূতাবাসেরও কোনো খোঁজ নেই। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে? কোনো নির্দেশনাই আসেনি।

 

শুধু ছনু মিয়া নন। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে এখনো আটক আছেন আরও দুই ভারতীয় নাগরিক। উজ্জ্বল চৌধুরী ও রুপসিনি। তারা এখনো সাজা ভোগ করছেন। তাদেরও এই বছরও সাজা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, সাজা শেষ হলে তাদের পরিণতিও কি ছনু মিয়ার মতোই হবে?

 

কারা বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য, নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং প্রশাসনিক ব্যয় মিলিয়ে বাংলাদেশের কারাগারে প্রতিটি বন্দির পেছনে সরকারের দৈনিক ব্যয় ন্যূনতম ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা। এই হিসাবে ছনু মিয়ার এক বছরের সাজার মেয়াদেই সরকারের গুনতে হয়েছে ৫৪ হাজার ৭৫০ থেকে ৯১ হাজার ২৫০ টাকা।

 

কিন্তু সাজা শেষ হয়েছে বহু আগেই। এরপর থেকে আরও প্রায় সাত বছর ধরে তিনি বিনা কারণে কারাগারে পড়ে আছেন। এই সাত বছরে অর্থাৎ আনুমানিক ২ হাজার ৫৫৫ দিনে শুধু তার পেছনেই সরকারি কোষাগার থেকে বেরিয়ে গেছে আরও ৩ লক্ষ ৮৩ হাজার থেকে ৬ লক্ষ ৩৮ হাজার টাকারও বেশি। সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে এই পর্যন্ত প্রায় ৮ বছরে অর্থাৎ ২ হাজার ৯২০ দিনে ছনু মিয়া নামের এই একজন ভারতীয় নাগরিকের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের ব্যয় হয়েছে ন্যূনতম ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৭ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা। আর প্রতিটি দিন যত যাচ্ছে, এই অঙ্ক কেবল বাড়ছেই। অর্থাৎ শুধু ছনু মিয়ার পেছনে বাংলাদেশ সরকারের প্রায় ৪ থেকে ৭ লক্ষ টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে এবং প্রতিদিন এই হিসাব বাড়ছে।

 

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন বন্দির পেছনে মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয় বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে, যা খাবার, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সেবা মিলিয়ে। সেই হিসাবে মাসিক ৩০ হাজার টাকা ধরলে ছনু মিয়ার ৮ বছরের মোট সরকারি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

 

তবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একজন কয়েদির জন্য সকালে ১৯০ গ্রাম রুটি। দুপুরে ও রাতের খাবার থাকে। এর বাইরে একজন কয়েদি বিদ্যুত ব্যবহার, পানির ব্যবহার ও ওয়াশরুমের খরচতো আছেই। টাকার হিসেব সাধারণ আমরা করি না।

 

এবিআর

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।