দক্ষিণ পূর্ব

ডেঙ্গুর ঘাড়ে ভর করে চট্টগ্রামে ডাবের দাম আকাশছোঁয়া

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০১ রাত
পঠিত : ২
ডেঙ্গুর ঘাড়ে ভর করে চট্টগ্রামে ডাবের দাম আকাশছোঁয়া

ছবি

Degchibarictg

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তেই চট্টগ্রামে বেড়েছে ডাবের চাহিদা। আর সেই সুযোগে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে দামও। দুই মাস আগে যে বড় আকারের একটি ডাব ৯০ থেকে ১১০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটির দাম উঠেছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়। হাসপাতালসংলগ্ন এলাকায় কোথাও কোথাও চাওয়া হচ্ছে ২২০ টাকা পর্যন্ত।

অথচ ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে ডাবের সরবরাহে বড় কোনো সংকট নেই। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০ থেকে ২০ ট্রাক ডাব চট্টগ্রামে ঢুকছে। স্থানীয় পর্যায়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কেনা ডাব পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। এরপর কয়েক দফা হাতবদলের পর সেটিই খুচরা বাজারে দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের সামনে ডেঙ্গু আক্রান্ত পাঁচ বছরের ছেলের জন্য ডাব কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন কর্ণফুলীর ভ্যানচালক রফিক উদ্দিন। একটি বড় ডাবের দাম চাওয়া হয় ২০০ টাকা। হাসপাতালের আশপাশের কয়েকটি দোকান ঘুরেও শেষ পর্যন্ত ডাব কিনতে পারেননি তিনি।

একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন দিনমজুর রামিজ উদ্দিন। ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন তিনি। চিকিৎসক ডাবের পানি খাওয়ানোর পরামর্শ দিলেও ২০০ টাকা দাম শুনে ডাব কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন এই বাবা।

চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজনের জন্য ডাব কিনতে আসা সাহাব উদ্দিন বলেন, দুটি ডাব নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দাম শুনে শেষ পর্যন্ত একটি ডাব নিয়েই হাসপাতালে ফিরে যান।

শুধু চমেক নয়, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল ও আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের সামনেও একই চিত্র দেখা গেছে। এসব এলাকায় আগের তুলনায় ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেশি দামে ডাব বিক্রি হচ্ছে।

চট্টগ্রামের বাজারে আসা ডাবের বড় একটি অংশ আসে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে। স্থানীয় পর্যায়ে একটি ডাব ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কেনা হলেও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। এরপর খুচরা পর্যায়ে দাম বেড়ে যাচ্ছে আরও কয়েক গুণ।

ফিরিঙ্গী বাজার, মাঝিরঘাট, চাক্তাই, অক্সিজেন, রেয়াজউদ্দিন বাজার ও কালুরঘাটে ডাবের বড় বাজার রয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ, হাতবদলের ব্যয় এবং সাম্প্রতিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দাম বেড়েছে।

ফিরিঙ্গী বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মো. আলম বলেন, বর্তমানে ডাবের চাহিদা তুঙ্গে। বছরের এ সময়ে জ্বরসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ায় ডাবের চাহিদা এমনিতেই বাড়ে। এবার গরম বেশি থাকায় চাহিদা আরও বেড়েছে।

তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, ডেঙ্গুর বাড়তি চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন।

ডাব ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডাবের উৎপাদন কমেছে। ভাদ্র-আশ্বিন সময়ে অনেক ডাব পেকে নারিকেলে পরিণত হওয়ায় এ সময় চাহিদার তুলনায় ডাবের সরবরাহ কম থাকে। এর সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ডাবের আবাদ হয়েছিল প্রায় ৫৬ হাজার ৬৬৬ একর জমিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ৫৩ হাজার ৫৪৪ একরে।

একই সময়ে ডাবের উৎপাদনও ১০ হাজার টনের বেশি কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডাব উৎপাদন হয়েছিল ৪ লাখ ৬৯ হাজার ১৫৯ দশমিক ৩২ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৩১ দশমিক ১৪ টনে। গাছপ্রতি উৎপাদনও কিছুটা কমেছে।

আনোয়ারার ডাব বিক্রেতা অন্তু দাশ বলেন, আগে ৩০ থেকে ৫০ টাকায় ডাব কেনা গেলেও এখন ক্ষেত থেকেই ৮০ টাকার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ হওয়ায় ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করেও তেমন লাভ থাকে না।

চমেক হাসপাতালের গেটের এক বিক্রেতার দাবি, রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকে ছোট-বড় ডাব গড়ে ১৩০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। পরে আকারভেদে ১৪০, ১৫০ এবং ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করছেন তারা। তার অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে দাম বাড়ছে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে রোগীদের পর্যাপ্ত তরল পান করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। ডাবের পানি সেই তরল গ্রহণের একটি সহজ উৎস হওয়ায় ডেঙ্গুর মৌসুমে এর চাহিদা বেড়ে যায়।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম সাত দিনেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬২৯ জনের বেশি। যার মধ্যে মহানগরে ৩৩৩ , উপজেলায় ২৪৫ ও অন্যান্য জেলার । এর মধ্যে বুধবার এক দিনেই ভর্তি হয়েছেন ৯৪ জন। এ বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৯৫ জন এবং মারা গেছেন ২১ জন।

রেয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী নেতা হায়দার আলী বলেন, ডাবের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও প্রায় এক মাস সময় লাগতে পারে। এরপর দাম কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপপরিচালক মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ডেঙ্গুর বাড়তি চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী ডাবের দাম বাড়িয়েছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চলমান রয়েছে ।

আর/ দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।