দক্ষিণ পূর্ব

পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ ডা. শাহাদাত হোসেনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৪৬ সকাল
পঠিত : ২৩
পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ ডা. শাহাদাত হোসেনের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন

ছবি

Degchibarictg

নুরুল ইসলাম রিপন

চিকিৎসা পেশা থেকে রাজনীতির মাঠ, আর সেখান থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব—ডা. শাহাদাত হোসেনের রাজনৈতিক পথচলা নানা ঘটনা ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ। পেশায় চিকিৎসক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এই নেতা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম মহানগরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে দলীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক মামলা ও কারাবাস পেরিয়ে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবনে রয়েছে নানা অধ্যায়।

ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির নেতৃত্বে

ডা. শাহাদাত হোসেন ১৯৬৬ সালের ২ জুন চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হরলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। একই প্রতিষ্ঠানে ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিষয়ে রেসিডেন্সি প্রোগ্রামও সম্পন্ন করেন।

১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক করা হয়। পরে ১৯৮৯ সালে সংগঠনটির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর রাজনৈতিক পথচলা পরবর্তী সময়ে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বিস্তৃত হয়।

শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৯১ সালে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সঙ্গে যুক্ত হন শাহাদাত হোসেন। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। পরবর্তী সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজরে আসেন এবং চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।

২০০৯ সালে তাঁকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে তিনি সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কারাবাস

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ডা. শাহাদাত হোসেনকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করতে হয়েছে বলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। কারাগারে থেকেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক পথচলার উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে আলোচিত।

এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক রাজনৈতিক মামলা করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট বিবরণে দাবি করা হয়েছে। এসব মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পাশাপাশি মামলা মোকাবিলা ও সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন।

মেয়র নির্বাচন ও দীর্ঘ আইনি লড়াই

২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ডা. শাহাদাত হোসেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, রেজাউল করিম চৌধুরী ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২৪৮ ভোট এবং শাহাদাত হোসেন ৫২ হাজার ৪৮৯ ভোট পান।

নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ তুলে ফলাফল বাতিলের দাবিতে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন শাহাদাত হোসেন। মামলায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ নয়জনকে বিবাদী করা হয়।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর চট্টগ্রামের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ খাইরুল আমীন মামলাটির রায় দেন। রায়ে রেজাউল করিম চৌধুরীকে নির্বাচিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল করে ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালতের নির্দেশনার পর ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর নির্বাচন কমিশন সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে তাঁকে মেয়র ঘোষণা করে। পরে ৩ নভেম্বর ঢাকায় সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সম্মেলনকক্ষে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ তাঁকে মেয়র হিসেবে শপথ পড়ান। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনের প্রায় তিন বছর নয় মাস পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ডা. শাহাদাত হোসেন।

মেয়র থেকে পূর্ণকালীন প্রশাসক

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে ডা. শাহাদাত হোসেনকে একই করপোরেশনের পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব জুয়েল রানা স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ৪ অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করবেন। এ দায়িত্বের জন্য বিধি অনুযায়ী মাসিক সম্মানী ও অন্যান্য ভাতা পাবেন তিনি। জনস্বার্থে জারি করা আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর করা হয়।

এর আগে ২০২৬ সালের মার্চ মাসেও তাঁকে পূর্ণকালীন প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব তৈরি করেছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে তখন এ বিষয়ে আদেশ জারি হয়নি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২১ সালে নির্বাচিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসাবে পরিষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়। তবে শাহাদাত হোসেন দাবি করেছিলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তাঁর মেয়াদ রয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার বিভাগের নথিতে বলা হয়, আদালত তাঁকে মেয়র ঘোষণা করলেও মেয়াদের বিষয়ে আলাদা কোনো নির্দেশনা দেননি।

এর আগে ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছিল স্থানীয় সরকার বিভাগ। ফলে মেয়াদের প্রশ্ন, নির্বাচন আয়োজন এবং প্রশাসক নিয়োগ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ঘিরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ডা. শাহাদাত হোসেনের রাজনৈতিক জীবন কেবল একজন চিকিৎসক থেকে দলীয় নেতা কিংবা মেয়র হয়ে ওঠার গল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ছাত্ররাজনীতিতে নেতৃত্ব, দলীয় সাংগঠনিক দায়িত্ব, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা মোকাবিলা এবং নির্বাচনী ফলাফলের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই।

২০২১ সালের নির্বাচনে পরাজিত ঘোষিত হওয়ার পর আদালতের রায়ে মেয়র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরবর্তী সময়ে সরকারের নিয়োগে পূর্ণকালীন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ তাঁর কর্মজীবনে নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা এবং চিকিৎসা পেশার অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক পথচলার মূল্যায়নে যেমন দলীয় নেতৃত্ব ও সংগ্রামের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নির্বাচনী প্রক্রিয়া, আদালতের রায় এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় দায়িত্ব পালনের ঘটনাগুলোও বিশেষভাবে বিবেচ্য।

সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।