দক্ষিণ পূর্ব

মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৩৭ দুপুর
পঠিত : ৩৩
মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে

মাদ্রাসায় শিশুদের শারীরিক নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ এবং নির্যাতনের পর অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হক। তাঁর মতে, এসব ঘটনা প্রতিরোধে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড ও আলেমসমাজের কার্যকর ভূমিকা জরুরি। অপরাধের অভিযোগ উঠলে তা ধামাচাপা দেওয়ার পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্‌ঘাটন এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়ন: আলেমসমাজ কি চুপই থাকবে’ শীর্ষক এক নিবন্ধে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। মনযূরুল হকের লেখা নিবন্ধটি এর আগে গত ২৯ জুলাই প্রকাশিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসায় পাঠকের আগ্রহ বিবেচনায় এটি পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে।


শারীরিক নির্যাতন থেকে যৌন নিপীড়ন
নিবন্ধের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক শিশুকে নির্মমভাবে মারধরের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। ভিডিওতে এক শিক্ষককে ৮ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুকে লাঠি দিয়ে পেটানো, লাথি মারা এবং মুখে ও পেটে ঘুষি দিতে দেখা যায়। আশপাশে বসে থাকা অন্য শিশুরা আতঙ্কের মধ্যে ঘটনাটি দেখছিল।


লেখক জানান, এ ধরনের দৃশ্য তাঁর কাছে নতুন নয়। শৈশবে মাদ্রাসায় পড়ার সময় শিক্ষকদের হাতে শিশুদের নির্মম শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা তিনি নিজেও প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনো সামান্য অপরাধের জন্য শিশুদের বেধড়ক মারধর করা হতো। কারও শরীরে বেতের আঘাতে রক্ত ঝরত, আবার কাউকে শিকল দিয়ে ভারী কাঠের টুকরার সঙ্গে বেঁধে রাখার ঘটনাও ঘটত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে, অতীতে অনেক অভিভাবকও শিক্ষকদের হাতে সন্তানদের শারীরিক শাস্তি দেওয়াকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতেন। ফলে শিশুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো অনেক সময় বাধাহীনভাবে চলতে পারত।


তবে শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতনই একমাত্র সমস্যা নয়। লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়ন, ছাত্রীদের ধর্ষণ, নির্যাতনের পর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং শিশুদের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে আপত্তিকর মন্তব্য ছড়ানোর অভিযোগও সামনে আসছে।


নিবন্ধে শিশুদের ওপর নিপীড়নের কয়েকটি ধরন তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক শাস্তি, ছেলে ও মেয়েশিশুর ওপর যৌন নির্যাতন, নির্যাতনের পর হত্যা বা আত্মহত্যার পরিস্থিতি তৈরি করা এবং নির্যাতনের দৃশ্য ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা।

লেখকের মতে, এসব অপরাধের প্রতিটি গুরুতর। তাই অপরাধের ধরন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বিচারহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়

নিবন্ধে টাঙ্গাইল সদরের একটি মাদ্রাসায় নয় বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির অভিযোগের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

অভিভাবকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক জিনের ভয় দেখিয়ে শিশুদের শরীরের সংবেদনশীল স্থানে স্পর্শ করতেন এবং তা মুঠোফোনে ধারণ করতে বলতেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রায় দুই মাসের মধ্যে জামিনে মুক্তি পান। পরে নতুন নামে আরেকটি মাদ্রাসা চালুর অভিযোগও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে কওমি মাদ্রাসার শীর্ষ বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার প্রধান পরিচালক মাওলানা নদভীর বক্তব্যও তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন মাদ্রাসার নিবন্ধন অন্য কারও নামে হয়ে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেছিলেন বোর্ডের ওই কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি বোর্ডের আইনগত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছিলেন।


এ প্রসঙ্গে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বোর্ড কি নিজ উদ্যোগে তদন্ত করতে পারে না? অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে কিংবা ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে তারা কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।


নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে বেফাকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিন মাসে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ৫৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫২টিই মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক। তবে লেখকের মতে, এ ধরনের দাবির পক্ষে প্রমাণ এবং তদন্তের প্রক্রিয়া প্রকাশ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের আশঙ্কা থাকতে পারে। কিন্তু সে কারণে সব অভিযোগ অস্বীকার করা কিংবা প্রকৃত ঘটনা তদন্ত না করে প্রতিষ্ঠানকে নির্দোষ ঘোষণা করা সমাধান নয়।

লেখকের মতে, বারবার শিশু নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পরও প্রতিষ্ঠান ও বোর্ড যদি জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে বেশি মনোযোগী হয়, তাহলে সমস্যার প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়।

তবে নিবন্ধে এ কথাও বলা হয়েছে, শিশু নিপীড়ন শুধু মাদ্রাসায় ঘটে না। পরিবার, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও গৃহশিক্ষকের কাছেও শিশুদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা রয়েছে। তাই সমস্যাটিকে শুধু মাদ্রাসার সঙ্গে যুক্ত করে দেখার সুযোগ নেই। বরং যেখানেই অপরাধ ঘটুক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করতে হবে।

কেন বাড়ছে শিশু নিপীড়নের ঝুঁকি

শিশু নিপীড়নের কারণ ব্যাখ্যা করতে নিবন্ধে অপরাধবিজ্ঞানের ‘রুটিন অ্যাকটিভিটি থিওরি’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকি বাড়ে যখন অপরাধ করার প্রবণতাসম্পন্ন ব্যক্তি, সহজে লক্ষ্যবস্তু হতে পারে এমন ভুক্তভোগী এবং কার্যকর তদারকির অভাব একই সঙ্গে উপস্থিত থাকে।

লেখকের মতে, কিছু আবাসিক মাদ্রাসা ও হেফজখানার কাঠামো শিশুদের জন্য এমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেখানে শিশুরা দীর্ঘ সময় পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তদারকির দায়িত্ব সীমিতসংখ্যক শিক্ষকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয় এবং বাইরের মানুষের নজরদারির সুযোগ কম থাকে।

এ ছাড়া শিক্ষকের কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত হিসেবে বিবেচনা করা হলে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়েও প্রতিবাদ করতে বা অভিভাবকদের জানাতে ভয় পেতে পারে।

লেখক স্পষ্ট করেছেন, এ ঝুঁকি শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য নয়। এতিমখানা, আবাসিক বিদ্যালয় ও ক্রীড়া একাডেমিসহ যেকোনো বদ্ধ পরিবেশে স্বাধীন তদারকি না থাকলে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তবে ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায় বাড়িয়ে দেয় বলে মনে করেন তিনি।

নিবন্ধে মনোবিজ্ঞানের ‘মোরাল লাইসেন্সিং’ ধারণারও উল্লেখ রয়েছে। লেখকের ব্যাখ্যায়, সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ও পোশাক অনেক সময় একজন ব্যক্তির প্রতি মানুষের বিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। সেই বিশ্বাসের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অনেকে সহজে তা বিশ্বাস করতে চান না। কোনো কোনো অপরাধীও এই সামাজিক আস্থাকে কাজে লাগাতে পারে।

এ ছাড়া নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান যদি ভুক্তভোগী শিশুর কথা বিশ্বাস না করে বা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে শিশুটি নতুন করে মানসিক আঘাতের শিকার হয়। মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘ইনস্টিটিউশনাল বিট্রেয়াল’ বা প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসভঙ্গ বলা হয়।

লেখকের মতে, শিশুদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানই যখন তাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন নির্যাতনের ক্ষতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহি জরুরি

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সত্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয় বলে নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন মনযূরুল হক। কোনো কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, ভুল বোঝাবুঝি বা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও উঠতে পারে।

তবে মিথ্যা অভিযোগের আশঙ্কা দেখিয়ে প্রকৃত অভিযোগ অস্বীকার করাও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন।

লেখকের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা উচিত। এতে প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে, একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগে নির্দোষ ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও কমবে।

নিবন্ধে ইসলামী আইনশাস্ত্রের ‘সাদ্দুজ জারায়ে’ নীতির কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ, ক্ষতি বা অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন পথ আগেভাগেই বন্ধ করা। লেখকের মতে, শিশুদের সুরক্ষায় এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ থাকা উচিত।

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের মারধরের যেসব দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির কতটা রয়েছে।

লেখকের বক্তব্য, কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা ও জবাবদিহির অভাব অপরাধ প্রতিরোধকে কঠিন করে তোলে।

মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়নের পরিসংখ্যান

নিবন্ধে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গত বছর মাদ্রাসায় অন্তত ৫২ শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের মাদ্রাসাগুলোতে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের অন্তত ২১১টি ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

লেখকের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, অনেক ঘটনা স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করা হয় কিংবা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার অভিযোগ প্রকাশ করেন না।

তবে এসব পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে মাদ্রাসায় নির্যাতনের প্রকৃত হার নির্ধারণ করা সম্ভব নয় বলে নিবন্ধের সামগ্রিক আলোচনায় ইঙ্গিত রয়েছে। শিশু নিপীড়নের ঘটনাগুলো যে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানে ঘটে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

অন্য দেশগুলোর অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের বাইরে অন্যান্য দেশেও আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কিছু দেশে এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সেনেগালে ‘দারা’ নামে পরিচিত আবাসিক কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে শিশুদের নির্যাতনের অভিযোগের পর শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনার মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা উন্নত করার চেষ্টা হয়েছে।

পাকিস্তানে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের ভিডিও প্রকাশের পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল বলেও নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে। এরপর মাদ্রাসাগুলোর আচরণবিধি ও নিবন্ধনব্যবস্থা নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশু সুরক্ষার জন্য সরকারি সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগের উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স, গোপন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, হটলাইন এবং শিক্ষক নিয়োগের আগে মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়নের মতো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক।

এসব উদাহরণের আলোকে তাঁর মত, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; সেগুলোর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে।


শিশু সুরক্ষায় কী করা দরকার

নিবন্ধে বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোতে শিশু সুরক্ষার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়োগের আগে তাঁদের অতীত রেকর্ড যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর একান্তে অবস্থানের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে, যাতে নির্যাতনের ঝুঁকি কমানো যায়।

তৃতীয়ত, শিশু ও অভিভাবকেরা যেন নিরাপদে অভিযোগ জানাতে পারেন, সে জন্য গোপন অভিযোগব্যবস্থা ও হটলাইন চালু করা জরুরি। চতুর্থত, মাদ্রাসা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন শিশু সুরক্ষা সেল গঠন করে অভিযোগ তদন্ত ও প্রতিকারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

পাশাপাশি আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থায় ছোট শিশুদের দীর্ঘ সময় পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার পরিবর্তে অনাবাসিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন লেখক। এতে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতে পারবেন এবং সম্ভাব্য নির্যাতনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সহজ হবে।

নিবন্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের একটি ঘটনার উল্লেখও রয়েছে। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, কয়েকজন তরুণ ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য তাঁর কাছে এলে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া, পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা দেওয়া এবং নিজের মতো নামাজ আদায় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের ৬৩১ নম্বর হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে।

এই উদাহরণ সামনে রেখে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, ছয় থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের বছরের পর বছর পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে আবাসিক শিক্ষাব্যবস্থায় আটকে রাখা কতটা যুক্তিসংগত।

তাঁর মতে, আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু অভিভাবকের নয়। রাষ্ট্র, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা বোর্ড—সব পক্ষকেই এ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

নীরবতা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চান লেখক

নিবন্ধের শেষাংশে মনযূরুল হক বলেছেন, মাদ্রাসায় শিশু নিপীড়নের মতো ঘটনা প্রতিরোধে আলেমসমাজকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে কার্যকর সংস্কার আনতে হবে। অভিযোগ উঠলে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার নামে কোনো অপরাধের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া উচিত নয় বলেও মত দিয়েছেন তিনি। বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখা সম্ভব।

লেখকের মতে, শিশু নিপীড়নের ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিরোধ ও প্রতিকারের উদ্যোগ না নিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তাহলে সেই নিষ্ক্রিয়তা অপরাধের বিস্তার ঘটাতে পারে।

তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আলেমসমাজ যদি নিজেদের প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শিশু নিপীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে এবং অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

নিবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্ধবিশ্বাস নয়, বরং স্বচ্ছতা, স্বাধীন তদারকি, জবাবদিহি ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।