ফুটবল মানে লিওনেল মেসি। আর মেসি মানে—পড়ে যাওয়া, উঠে দাঁড়ানো, তারপর ইতিহাস লেখা। ৩০ মিনিটে যন্ত্রণা, ৩০ মিনিটে জয়গান; বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট এখন তাঁর।
এবারও তাই হলো। পেনাল্টি মিস। স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ। শতকোটি কোটি মানুষের বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল। মাথা নিচু করে হাঁটলেন তিনি। ৩০ মিনিট। মাত্র ৩০ মিনিট পর বলটা আবার পায়ে। ডি-বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের কার্লিং শট। গোলকিপার ঝাঁপালেন, বল জালে। অসাধারণ। অবিশ্বাস্য। মেসিসুলভ।
যন্ত্রণা থেকে জয়গান—এই গল্পটাই তো মেসির।
ওই গোলটার সাথেই ভেঙে গেল আরেকটা দেয়াল। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড এখন একান্তই লিওনেল মেসির। কাতার ২০২ থেকে ২০২৬—পর বিশ্বকাপে গোল করে, অ্যাসিস্ট করে, ম্যাচ বাঁচিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিলেন বয়সটা শুধু একটা সংখ্যা।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০২-এ সোনার বল, সোনার বুট—সব জিতে দেশকে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। ২০২৬-এ এসে রেকর্ডটাও নিজের করে নিলেন।
৮ বার বিশ্বসেরার মুকুট। ২০০৯ থেকে ২০২৩—১৪ বছরের রাজত্ব। মেসির আগে, মেসির পরে—এমন ধারাবাহিকতা আর কারও নেই।
বার্সেলোনার জার্সিতে ৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল। এক ক্লাবে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড এখনও অক্ষত। ১০ নম্বর জার্সিটা তাঁর জন্যই বানানো মনে হতো।
ক্যারিয়ারে ৮০+ গোল, ৩৫০+ অ্যাসিস্ট। গোল করতে পারেন, করাতেও পারেন। ডি-বক্সের আশেপাশে বল পেলেই মনে হয় গোল হয়ে গেছে।
২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল হার, ২০১৬ কোপা ফাইনাল হার—কেঁদে ফেলেছিলেন, অবসর নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তারপর ফিরে এসে ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ—ট্রফি ছাড়া মেসি অসম্পূর্ণ ছিল, ট্রফিও মেসি ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিল।
মেসির সবচেয়ে বড় গুণ—ভদ্রতা। মাঠে প্রতিপক্ষকে ফাউল করলে হাত বাড়িয়ে তোলেন। গোল করে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকান। কোনো অহংকার নেই, চিৎকার নেই। ড্রিবলিংটা দেখুন—বলটা যেন পায়ে আঠা দিয়ে লাগানো। ৩-৪ জন ডিফেন্ডার কাটিয়ে বেরিয়ে যান, যেন ওরা স্ট্যাচু।
পেনাল্টি মিসের পর ৩০ মিনিটে যে গোলটা করলেন, ওটাই মেসি। ভেঙে পড়েন না। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য চিৎকার করেন না। বল কথা বলে।
ম্যারাডোনার দেশে ম্যারাডোনার পর মেসিই ঈশ্বর। বুয়েন্স আয়ার্সের অলি-গলিতে বাচ্চারা এখনও বলে—“একদিন মেসির মতো হবো”। রোজারিওর ছোট ছেলেটা, যে হরমোনজনিত সমস্যার জন্য ক্লাব ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমিয়েছিল, সে আজ গোটা ফুটবল বিশ্বের বাবা।
পেনাল্টি মিস মেসিকে থামাতে পারে না। সমালোচনা মেসিকে থামাতে পারে না। বয়সও না। ৩০ মিনিটের ব্যবধানে তিনি দেখিয়ে দিলেন—ফুটবলে শেষ কথা বলার অধিকার শুধু মেসির।
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডটা এখন তাঁর। কিন্তু আসল রেকর্ডটা কী জানেন? কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি যে ভালোবাসার রেকর্ড গড়েছেন, ওটা কেউ ভাঙতে পারবে না।
লিও, তুমি শুধু ফুটবলার না। তুমি একটা অনুভূতি।
মাসুদ ফরহান অভি/আর এইচ /দক্ষিণপূর্ব
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।