দক্ষিণ পূর্ব

রায়হানের পা কাটার নেপথ্যে ভিক্ষাবৃত্তি নয়, ট্রেন দুর্ঘটনা

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫১ সকাল
পঠিত : ৩২
রায়হানের পা কাটার নেপথ্যে ভিক্ষাবৃত্তি নয়, ট্রেন দুর্ঘটনা

ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক : 

‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর জন্য রাজধানীর একটি চক্র ১২ বছরের শিশু মো. রায়হানের পা কেটে দিয়েছে’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার সাতগড় গ্রামের এই শিশুকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া সেই অভিযোগের অনুসন্ধানে অবশ্য ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ভিক্ষাবৃত্তির উদ্দেশ্যে নয়, বরং ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তেই রায়হানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল।

ঢাকা রেলওয়ে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গত ১১ জুন বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ফেরার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয় রায়হান। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলেন চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের পর তাকে আইসিইউতেও রাখা হয়। পরে মাথায় আঘাতের চিকিৎসার জন্য তাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ওই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, দুর্ঘটনার আগে রায়হান কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আল আমিন নামে এক যুবকের সঙ্গে লভ্যাংশের বিনিময়ে পানি বিক্রি করত। পাশাপাশি সে ভিক্ষাবৃত্তিও করত।

চিকিৎসার পর প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে থাকতে হয় রায়হানকে। এ সময় তার পরিচর্যার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে আরেছা নামে একজন আয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রায় দেড় মাস শিশুটির দেখাশোনা করেন।

পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে রায়হান কমলাপুর স্টেশনের জরিনা নামে এক নারীর কাছে আশ্রয় নেয়। স্টেশনে ওই নারী ‘মালির মা’ নামে পরিচিত ছিলেন। সেখানে থাকাকালে রায়হান ভিক্ষা করত।

পুলিশ কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে রায়হান তাদের জানায় তার মা মারা গেছেন এবং সে বাড়ি ফিরতে চায়। পরে তার বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ীতে নিয়ে গিয়ে একটি বাসে তুলে দেয়।

রায়হানকে সহযোগিতায় রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজুল করিমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা। একইভাবে মিনা নামে স্টেশনের এক নারীও শিশুটির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারীকে অভিযুক্ত করে বিভিন্ন পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে বলে দাবি পুলিশের ওই কর্মকর্তার।

এদিকে রায়হান ট্রেন দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পরের একটি ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভিডিওতে হাসপাতালের মেঝেতে বসে রায়হানকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। তখন সে জানায়, তার মা-বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটে আঘাতের চিহ্নও দেখা যায়।

রায়হান চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দীনের ছেলে। সে একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত মাস আগে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতি এলাকার একটি মাহফিলে স্থানীয়রা রায়হানকে দেখতে পান। পরে পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হলে তার বাবা সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন। রায়হানের বাবা দিনমজুর। তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে এবং বর্তমানে তারা আলাদা সংসারে বসবাস করছেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে রায়হান তার সৎমায়ের সঙ্গে থাকত।

পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করার সময় তার একটি পা না থাকায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের চিহ্ন দেখতে পান। এরপরই তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর কোনো চক্র পা কেটে দিয়েছে—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে ঢাকা রেলওয়ে থানার পুলিশের ওই কর্মকর্তার দেওয়া ঘটনার ধারাবাহিক তথ্য অনুযায়ী, রায়হানের পা কেটে ফেলার সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তির কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। বরং ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তেই অস্ত্রোপচার করে তার পা অপসারণ করা হয়।

এ বিষয়ে রায়হান ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হননি। তারা বর্তমানে হাসপাতালে রয়েছেন বলে জানা গেছে। 

আরএইচ / 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।