দক্ষিণ পূর্ব

সেন্টমার্টিনের বাতাসে এখন অন্য এক গন্ধ

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১৫ সকাল
পঠিত : ৪৭
সেন্টমার্টিনের বাতাসে এখন অন্য এক গন্ধ

ছবি

সেন্টমার্টিনের বাতাসে এখন অন্য এক গন্ধ। নোনা হাওয়ার সাথে হলুদ, মরিচ আর শুকনো মাছের ঘ্রাণ মিশে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কেউ বারবিকিউর জন্য মাছ মেরিনেট করে রেখেছে। কাছে গেলেই ভুল ভাঙে। এটা বারবিকিউ নয়, এটা আগামী দিনের জন্য বাঁচিয়ে রাখার প্রস্তুতি।

সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী তৈয়ব উল্লাহ জানান, সেন্টমার্টিনে শুটকি শুকানো শুরু হচ্ছে। এখন অনেকে নিজেরা খাওয়ার জন্য শুকাচ্ছে মাছ। 

তিনি বলেন, সম্প্রতি দেখলাম আমার এক প্রতিবেশী নিজেদের ট্রলারে পাওয়া একদম টাটকা কোরাল মাছ মসলা মেখে রোদে শুকাতে দিয়েছেন উঠোনে। মসলা দিয়ে শুকালে রান্নার সময় আর কোনো ঝামেলা নেই। শুধু পছন্দমতো টুকরো করে হাঁড়িতে ভরে গরম পানি আর তরকারি ঢেলে দিলেই হলো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, দুর্গন্ধ ঠেকাতেই বোধহয় হলুদ দিয়েছে। হলুদ তো সুগন্ধি মসলা। কাছে গিয়ে দেখি, গল্পটা আরও গভীর।

তিনি বলেন, মাছের উপর টানানো হয়েছে নেট। কাক আর মাছির হাত থেকে বাঁচতে। আর যাতে মাছের ভেতরে পোকা না হয়, মাছি ডিম না পাড়ে, সেজন্য মাখানো হয়েছে হলুদ। একেবারে দেশি, কার্যকর পদ্ধতি। কোনো বিষ নেই, কোনো কেমিক্যাল নেই। শুধু হলুদ, রোদ আর যত্ন। হলুদ মাখা সেই আধা-শুকনো কোরালের গন্ধ নাকে লাগতেই লোভ হয়। কিনতে চাইলাম। হেসে বললেন, বেচার জন্য না ভাই, এটা ঘরের জন্য। কারণ সামনে সমুদ্রর ২২ দিনের নীরবতা চলবে।

ফেসবুকে সেন্টমার্টিনের শুটকি শুকানোর নানা ছবিও পোস্ট করেন তৈয়ব উল্লাহ। এছাড়াও দ্বীপবাসীর সুখ-দুঃখের গল্পও জানান দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

আগামী ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সাগর ও নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। মা ইলিশের প্রজনন মৌসুম। অনেকে ভাবেন ইলিশ তো সামুদ্রিক মাছ, নিষেধাজ্ঞা নদীতে হবে। আসলে ইলিশ সারা বছর সাগরে থাকে, ডিম দিতে ছুটে আসে মিঠা পানির নদীতে। তাই এই সময় সাগরেও জাল ফেলা বন্ধ। এই আইনটা ভবিষ্যতের লাখ লাখ ইলিশের জন্য।

আর এই ২২ দিন উপকূলের মানুষ কী খাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই হলো এই শুটকি। সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, সোনাদিয়া- এই উপকূলে শুটকি শুধু পণ্য নয়, এটা টিকে থাকার কৌশল। যখন ট্রলার ঘাটে বাঁধা থাকবে, যখন বাজারে মাছ উঠবে না, তখন হাঁড়িতে উঠবে এই যত্ন করে শুকানো কোরাল, লইট্টা, ছুরি।

এবার সেন্ট মার্টিনে শুটকির মৌসুমটা শুরু হয়েছে একটু আগেই। জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ কয়েকটা ট্রিপে যা পাওয়া যায়, তার একটা অংশ শুকিয়ে রাখতে হবে। তাই উঠোনে উঠোনে বাঁশের মাচা, মাচার উপর নেট, নেটের নিচে হলুদ মাখা সারি সারি মাছ।

এখানে শুটকি মানে শুধু লবণ দিয়ে শুকানো নয়। এখন স্বাদ বদলেছে। অনেকেই হালকা মরিচ, হলুদ, সামান্য সরিষা বাটা মেখে শুকাচ্ছেন। এতে দুটি লাভ। এক, মাছি আসে না। দুই, রান্নার সময় আলাদা করে মসলা কষানোর ঝামেলা কমে। গরম ভাতে এই শুটকির ভর্তা বা তরকারি, নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোতে অমৃতের মতো লাগে।

দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে সেই কোরালের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সেন্ট মার্টিনের মানুষ সাগরকে শুধু ধরে না, সাগরকে পড়তেও জানে। তারা জানে কখন ধরতে হয়, আর কখন ছেড়ে দিতে হয়। ২২ দিনের এই না-ধরা আসলে আরও বেশি করে পাওয়ার জন্যই।

আর সেই অপেক্ষার দিনগুলো উতরে দেওয়ার জন্য রোদে শুকাচ্ছে তাদের যত্ন, তাদের হলুদ মাখা ভবিষ্যৎ।

এমএ/ দক্ষিণপূর্ব 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।