নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনে দীর্ঘ ৪৪ বছর পর আবারও নেতৃত্বে ফিরেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির সমর্থিত প্যানেল ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ ভিপি ও জিএসসহ ২৬ টি পদের মধ্যে ২৪টি পদে বিজয়ী হয়েছে। নির্বাচনে ছাত্রদল এজিএস পদে জিতেছে।আর সহ ক্রীড়া সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেছেন।জুলাই অভ্যুত্থানের পর হওয়া এই ভোটের মাধ্যমে দেশের তিনটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নেতৃত্ব গেল দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা সংগঠনটির হাতে। নির্বাচনে সংঘাতের শঙ্কা থাকলেও বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযোগ ছাড়া বড় কোন অঘটন ঘটেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়,দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশে ও সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদ ভবনে। ভোট গ্রহণের সময় অমোচনীয় কালি ব্যবহার না হওয়ার অভিযোগ করে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ভবনের কেন্দ্রে কর্মকর্তার স্বাক্ষর ছাড়াই ব্যালট পেপার পাওয়ার অভিযোগ উঠে। তবে নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে সব অভিযোগ খতিয়ে দেখে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়।এছাড়া ছাত্রদলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুইটি হল সংসদের ভিপি পদে ফল পুন:গণনা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) ভোর সাড়ে চারটায় সপ্তম চাকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন ফলাফল ঘোষণার সময় বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে। প্রার্থী ও ভোটাররা নির্বাচনে অসাধারণ উৎসবমুখর অংশগ্রহণ করেছেন।
নির্বাচনে ভিপি (সহসভাপতি) পদে ছাত্রশিবিরের মো. ইব্রাহিম হোসেন ৭ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি সংগঠনটির চট্টগ্রাম মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ও ইতিহাস বিভাগের এমফিলের শিক্ষার্থী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের প্যানেলের সাজ্জাদ হোসেন পেয়েছেন ৪ হাজার ৩৭৪ ভোট।
জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে ৮ হাজার ৩১ ভোট নির্বাচিত হয়েছেন একই প্যানেলের সাঈদ বিন হাবিব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদক ও ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের মোহাম্মদ শাফায়াত পেয়েছেন ২ হাজার ৭৩৪ ভোট।
এদিকে চাকসুর মোট ২৬টি পদে মধ্যে মাত্র একটি পদে জিতেছে ছাত্রদল। ছাত্রদলের প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক এজিএস (সহ সাধারণ সম্পাদক) পদে পেয়েছেন ৭ হাজার ১৪ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবির প্যানেলের সাজ্জাদ হোছন মুন্না পেয়েছেন ৫ হাজার ৪৫ ভোট।
খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে মো. শাওন পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৩৫ ভোট, তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজাহারুল ইসলাম বিপ্লব পেয়েছেন ৪ হাজার ২৫৩ ভোট। সহ-খেলাধুলা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র জোটের প্রার্থী তামান্না মাহবুব প্রীতি পেয়েছেন ৪ হাজার ৯২৯ ভোটে জয়।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক হারেজুল ইসলাম পেয়েছেন ৫ হাজার ৩২২ ভোট, সহ-সম্পাদক জিহাদ হোসাইন জিহাদ জয়ী হয়েছেন ৬ হাজার ৭৮১ ভোটে। দপ্তর সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান সামান্য ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন-তিনি পেয়েছেন ৩ হাজার ২৫৮ ভোট, আর প্রতিদ্বন্দ্বী তাহসান হাবিব পেয়েছেন ৩ হাজার ২৩৬ ভোট। সহ-দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল আদন নুসরাত পেয়েছেন ৬ হাজার ৯৮২ ভোটে জয়।
ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক পদে নাহিমা আক্তার দ্বীপা পেয়েছেন ৬ হাজার ১৬৫ ভোট, তার নিকটতম সুমাইয়া সিকদার পেয়েছেন ৩ হাজার ৮২৬ ভোট। সহ-ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস রিতা পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৩৬ ভোটে জয়। বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি সম্পাদক পদে মাহবুবুর রহমান পেয়েছেন ৬ হাজার ১২৮ ভোট, গবেষণা ও উদ্ভাবন সম্পাদক তানভীর আঞ্জুম শোভন পেয়েছেন ৫ হাজার ৬২২ ভোট। সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক পদে তাহসিনা রহমান নির্বাচিত হয়েছেন ৪ হাজার ২২৭ ভোটে।
স্বাস্থ্য সম্পাদক আফনান হাসান ইমরান পেয়েছেন ৫ হাজার ১১ ভোট, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক মোনায়েম শরীফ পেয়েছেন ৪ হাজার ৮৭৯ ভোট, আর ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান সোহান জয়ী হয়েছেন ৪ হাজার ৯৮৭ ভোটে। যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক পদে মো. ইসহাক ভূঁঞা পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৬৩ ভোট, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে ফজলে রাব্বি তৌহিদ সর্বাধিক ৭ হাজার ৩৭৬ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ পেয়েছেন ৬ হাজার ৫৮৫ ভোট, সহ-যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক ওবায়দুল সালমানও বিজয়ী হয়েছেন।
নির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছেন-জান্নাতুল ফেরদৌস সানজিদা ৬ হাজার ১১৫ ভোটে, আদনান শরীফ ৪ হাজার ৭৮৯ ভোট, আকাশ দাশ ৪ হাজার ৪১৫ ভোট, সালমান ফারসী ৪ হাজার ৪১২ ভোট এবং সোহানুর রহমান ৪ হাজার ৩১২ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।
চাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সর্বশেষ বিজয় ছিল ১৯৮১ সালে। সেবার ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন জসিম উদ্দিন সরকার ও জিএস হন আবদুল গাফফার। এরপর ১৯৯০ সালের নির্বাচনে 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য'র কাছে পরাজিত হয় শিবির। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্যাম্পাসে শিবির নিষিদ্ধ হয় এবং সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। প্রায় এক দশকের নিষ্ক্রিয়তার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শিবির আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফেরে।
প্রায় এক বছর না যেতেই ২০২৫ সালের চাকসু নির্বাচনে তাদের এমন বিজয় ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতবার চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮১, ১৯৯০ এবং এবার ২০২৫ সালে। ১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ তিন দশক চাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। এবার নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত করেছে।
ক্লিন ইমেজ এবং সুসংগঠিতভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্রশিবিরের দলীয় কর্মসূচি ও শিক্ষার্থীবান্ধব নানা কর্মকাণ্ড পৌঁছে দেওয়ায় এ অভাবনীয় জয় হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস) সংগঠিত ছিল না। এর ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে তারা কর্মপরিকল্পনা সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারেনি। শিবিরের প্রার্থীদের তুলনায় ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাম সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেনি।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, চবিতে শিবিরের অবস্থান এমনিতেই ভালো।তবে এবার ছাত্রদল থেকে প্রায় দ্বিগুণ বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন শিবিরের প্রার্থীরা। ছাত্রদলের এ ভূমিধস পরাজয়ে হতবাক অনেকেই। কেন এই ভরাডুবি হলো, সেই হিসাব মেলাতে হবে।
তিনি বলেন, ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অনৈক্য আর প্রস্তুতির অভাব নির্বাচনে ভরাডুবির মূল কারণ বলে মনে করেন বর্তমান শিক্ষার্থীরা।এছাড়া বড় ব্যবধানে এই হারের পেছনে গ্রুপিং ও অনিয়ম দায়ী রয়েছে। ভোটের দুইদিন আগে কেন সিনিয়র সহ সভাপতি মামুনকে বহিষ্কার করা হলো সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ।
এদিকে ২৪টি পদের প্রত্যেকটিতে বড় ব্যবধানে জিতলেও এজিএস পদটি হাতছাড়া হওয়া নিয়ে সমালোচনা করছে শিবির সংশ্লিষ্ট অনেকে।এজিএস পদে তুলনামূলক দুর্বল প্রার্থীকে শিবির মনোনয়ন দিয়েছে বলে অভিযোগ আছে।এছাড়া একই পদে শিবিরের সাবেক নেতা শাখাওয়াত হোসেনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করাকেও হারের পেছনে দায়ী করছেন তারা। চবি শিবিরের গত কমিটির কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক শাখাওয়াত এই নির্বাচনে ৫৩৫টি ভোট পেয়েছেন।একইসাথে এজিএস পদে বিজয়ী তৌফিককে ছাত্রদলের প্যানেলের সবচেয়ে স্মার্ট প্রার্থী হিসেবে দেখা গেছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন,সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে।এখন যারা জিতেছেন আর হেরেছেন সবাইকে নিয়ে আমরা কাজ করবো।
এদিকে চাকসু নির্বাচনে নির্বাচিতদের কাজে সহযোগিতা ও শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গতকাল (বুধবার) ছিল আমাদের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। চাকসু নির্বাচনে ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে অনেক অভিযোগ ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে রায় দিয়েছে তাই আসল। নির্বাচনে অমোচনীয় কালির ব্যবহার হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল মনে করে, এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল।
জানা যায়, ১৯৬৬ সালে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে; আর সবশেষ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে। ১৯৭০ সালের প্রথম চাকসু নির্বাচনে ভিপি ও জিএস নির্বাচিত হন ছাত্রলীগের মোহাম্মদ ইব্রাহীম ও আবদুর রব। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়াতে তৎকালীন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন চাকসু জিএস আবদুর রব। ১৯৭২ সালে দ্বিতীয় নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়নের শামসুজ্জামান হীরা ভিপি এবং জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে তৃতীয় নির্বাচনে জাসদ ছাত্রলীগের এস এম ফজলুল হক ভিপি এবং গোলাম জিলানী চৌধুরী জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে চতুর্থ নির্বাচনে ভিপি হন জাসদ ছাত্রলীগের মাজহারুল হক শাহ চৌধুরী এবং জিএস হন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের জমির চৌধুরী। ১৯৮১ সালে পঞ্চম নির্বাচনে ভিপি ও জিএস হন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জসিম উদ্দিন সরকার ও আবদুল গাফফার। ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ নির্বাচনে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের প্রার্থী জাতীয় ছাত্রলীগের নাজিম উদ্দিন ভিপি নির্বাচিত হন। জিএস হয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি আজিম উদ্দিন আহমদ।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।