শনিবার (৩ অক্টোবর) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন কমিটির নেতারা।
কমিটির সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, গত ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি কেন সভার ‘বিবিধ’ এজেন্ডায় উপস্থাপন করা হলো এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা কেন মূল এজেন্ডায় হয়নি।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি, রাজস্ব, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এনসিটি বন্দরের অন্যতম প্রধান কনটেইনার টার্মিনাল হওয়ায় এর ১৫ বছরের কনসেশন কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়।
তাদের মতে, এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আগে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটি পরিচালনা করলে সম্ভাব্য আয়, সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশনের ব্যবহার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কনসেশনে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তুলনামূলক মূল্যায়ন প্রকাশ করা প্রয়োজন।
কমিটি জানায়, তারা বিদেশি বিনিয়োগ বা আধুনিক প্রযুক্তির বিরোধিতা করছে না। তবে জাতীয় কৌশলগত অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব, কর্মসংস্থান, শ্রমিক-কর্মচারীদের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালের সঙ্গে করা ২২ বছরের চুক্তির অভিজ্ঞতাও পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে কমিটি।
ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান, শিল্পের বিকাশ, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের সময়ে এনসিটি ও সিসিটির মতো কৌশলগত অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়োর কারণ জনগণের সামনে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতি, রাজস্ব, কর্মসংস্থান ও জাতীয় কৌশলগত স্বার্থে কী ধরনের সুবিধা বা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রকাশ না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কমিটি জানায়, এনসিটি ও সিসিটি ইজারার উদ্যোগের বিরুদ্ধে তারা ইতোমধ্যে সংবাদ সম্মেলন, প্রতীকী অনশন, কালো ও লাল পতাকা মিছিল, মশাল মিছিল, বিক্ষোভ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক এবং প্রয়োজনে জাতীয় সংলাপের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।
বন্দর রক্ষা কমিটি আরও জানায়, তাদের আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে নয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের উদ্বেগ তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষাই তাদের উদ্দেশ্য।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
এনসিটি ও ওভারফ্লো ইয়ার্ডের প্রস্তাবিত ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল।
সিসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চিঠি প্রত্যাহার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বন্দর শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।
ইজারাবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের বদলি বা প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ।
সংবাদ সম্মেলন থেকে জানানো হয়, আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান ফটকে দিনব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে বন্দর রক্ষা কমিটি।
ওই সময়ের মধ্যে সরকার এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিলের বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা না দিলে অবস্থান কর্মসূচি থেকেই পরবর্তী বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে জানানো হয়।
একই সঙ্গে এনসিটি ও সিসিটি ইজারাবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত বিভিন্ন প্ল্যাটফরম, সংগঠন ও জোটকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
বন্দর রক্ষা কমিটির নেতারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ। বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় স্বার্থ সরাসরি জড়িত।
তাই এনসিটি ও সিসিটি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনগণের মতামত, শ্রমিক-কর্মচারীদের স্বার্থ এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।