দক্ষিণ পূর্ব

ডাকসুতে ইতিহাস গড়ল ছাত্রশিবির

মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পঠিত :
ডাকসুতে ইতিহাস গড়ল ছাত্রশিবির
দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক

১৯৯০ সালের পর ২৮ বছর পার করে সর্বশেষ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে ছয় বছর পার করে ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হলো ডাকসু নির্বাচন। তবে দিনব্যাপী তুমুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। নির্বাচনে ভিপি-জিএস, এজিএসসহ ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতেই ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কারণে অবিস্মরণীয় এ ফল পান বলে শিক্ষার্থীদের ধারণা।

নির্বাচনে ভিপি পদে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) বড় ব্যবধানে জয় ঘরে তুলেছেন। এছাড়া, জিএস পদে একই প্যানেলের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ এবং এজিএস পদে মহিউদ্দিন খান জয়ী হয়েছেন। এছাড়া, হল সংসদেও শিবির সমর্থিত প্রার্থীদের বেশিরভাগই জয় পেয়েছেন। বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার পর ঢাবির সিনেট ভবনে আনুষ্ঠানিক ফলাফলে তাদের নাম ঘোষণা করেন ডাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার ১০৪ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মোট ৩৭ বার। স্বাধীনতার আগেই হয়েছে ৩০টি নির্বাচন। ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। আর স্বাধীনতার পর প্রথম ডাকসু নির্বাচন হয় ১৯৭২ সালে। ফলে ওই নির্বাচন এবং ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি ছাত্রশিবির। এই দুই নির্বাচনের মধ্যেও আরও পাঁচবার ডাকসু হয়েছে। ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮২, ১৯৮৯ এবং ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণও করেছে ছাত্রশিবির। শুধু ১৯৮২ সালের নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের প্যানেলের আবুল আহসান নামে একজন ডাকসুর কার্যকরী সদস্য নির্বাচিত হন।

কেমন করেছিল ছাত্র সংগঠনগুলো
স্বাধীনতার পর প্রায় সব নির্বাচনে সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠনই ডাকসুতে সাফল্য পেয়েছে। যদিও ২০১৯ সালের নির্বাচন ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম, যেখানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ২৩টি পদে জয়ী হয়। যদিও নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।

স্বাধীনতার পর হওয়া প্রথম ডাকসু নির্বাচনে ১৯৭২ সালে ভিপি নির্বাচিত হন ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও জিএস পদে জয়ী হন একই সংগঠনের মাহবুব জামান। ১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পরবর্তী ডাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়েছিল। তবে উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে ওই নির্বাচনে ফল শেষ পর্যন্ত ঘোষণা হয়নি।

বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি। ওই বছরই অনুষ্ঠিত হয় আরেকটি ডাকসু নির্বাচন। ১৯৭৯ সালের ২৪ জুলাইয়ের নির্বাচনে অংশ নেয় ছাত্রদল। তবে সেবার কোনো পদেই জয় পায়নি সংগঠনটি। ওই নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না। একই প্যানেলের আখতারুজ্জামান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ডাকসুর ১৯টির মধ্যে ১৫টি পদে জয় পায় তাঁদের প্যানেল।

এরপর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালের ১১ নভেম্বর। ওই নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো ভিপি হন মাহমুদুর রহমান মান্না এবং জিএস হন আখতারুজ্জামান। আগের নির্বাচনে তাঁরা ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের প্রার্থী, তবে ওই সময় অংশ নেন নবগঠিত বাসদ ছাত্রলীগের ব্যানারে।

১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর এক বছরের ব্যবধানে ১৯৮২ সালের ২৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ভিপি পদে জয় পান মান্না-সমর্থিত বাসদ ছাত্রলীগের আখতারুজ্জামান। জিএস নির্বাচিত হন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। ছাত্রদলের গোলাম সারোয়ার মিলন ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্যানেল হল সংসদে শক্ত অবস্থান তৈরি করে। ১১টি হল সংসদে মোট ১৩২ আসনের মধ্যে ছাত্রদল জয় পায় ৬৫টিতে।

দীর্ঘ সাত বছর বিরতির পর ১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন। ওই নির্বাচনে ছাত্রদলের প্রভাব ঠেকাতে একত্রিত হয় ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী, বাসদ ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্রলীগ (মু-না) এবং ছাত্রলীগ (সু-র) মিলে গঠন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।

ডাকসুর সব পদে জয় পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ভিপি নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, জিএস হন জাসদ ছাত্রলীগের মুশতাক হোসেন এবং সহকারী সাধারন সম্পাদক হন ছাত্র ইউনিয়নের নাসির। অন্যদিকে, নির্বাচনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ছাত্রদলের শামসুজ্জামান দুদু ও আসাদুজ্জামান রিপন।

১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। সেবার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে পূর্ণ প্যানেলে জয়ী হয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ হাজার। প্রচারণায় ছাত্রদল সামনে আনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অঙ্গীকার, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাড়া ফেলে। এই নির্বাচনে ভিপি পদে জয়ী হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান এবং জিএস হন খায়রুল কবির খোকন। সেবার ডাকসু ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ১৮৮ পদের মধ্যে ১৫১টিতেই বিজয়ী হয় ছাত্রদল।

প্রায় ২৯ বছর পর ২০১৯ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভিপি পদে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেল থেকে নুরুল হক নুর। তিনি বর্তমানে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি।

২০১৯ সালে ডাকসুতে জিএস হন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে জয়ী হন ছাত্রলীগের (বর্তমান সভাপতি) সাদ্দাম হোসেন। ওই নির্বাচনে ২৫টি পদের মধ্যে ভিপি এবং সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক ছাড়া বাকি ২৩টি পদে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়া আখতার হোসেন তখন ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রার্থী ছিলেন। তিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব।

ছাত্রশিবিরের জয়

দীর্ঘ ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত হয় মিনি পার্লামেন্টখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টায় শুরু হয় ভোটগ্রহণ, যা বিরতিহীনভাবে চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। বড় কোনো ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয় ডাকসুর ৩৮তম নির্বাচন। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদে ২৮টি ও হল সংসদে ১৩ পদে ভোট দেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ভোটে ভিপি-জিএস, এজিএসসহ ২৮টি পদে ২৩টিতেই বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। 

ভিপি পদে ছাত্রশিবির প্যানেলের মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) পেয়েছেন ১৪ হাজার ৪২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান ৫ হাজার ৭০৮ ভোট পেয়েছেন।

১০ হাজার ৭৯৪ ভোট পেয়ে জয়ী হন এসএম ফরহাদ। তিনিও ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট থেকে লড়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল নেতা তানভীর বারী হামীম পেয়েছেন ৫ হাজার ২৮৩ ভোট। এছাড়া প্রতিরোধ পর্ষদের মেঘমল্লার বসু ৪ হাজার ৯৪৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

এজিএস পদেও বিজয়ী হন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মুহা. মহিউদ্দীন খান। তিনি ১১ হাজার ৭৭২ ভোট পেয়েছেন। ছাত্রদলের এজিএস প্রার্থী তানভীর আল হাদী মায়েদ পেয়েছেন ৫ হাজার ৬৪ ভোট।

এছাড়া আরও ২০ পদে বিজয় লাভ করেছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্রার্থীরা। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতেমা তাসনিম জুমা পেয়েছেন ১০ হাজার ৬৩১ ভোট। ৭ হাজার ৮৩৩ ভোট পেয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে জয়ী হন ইকবাল হায়দার। আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে খান জসিম পেয়েছেন ৯ হাজার ৭০৬ ভোট।

ছাত্র পরিবহন সম্পাদক হিসেবে লড়ে আসিফ আবদুল্লাহ পেয়েছেন ৯ হাজার ৬১ ভোট। ৭ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন আরমান হোসাইন। কমন রুম, রিডিং রুম ও কাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে উম্মে ছালমা পেয়েছেন ৯ হাজার ৯২০ ভোট। ১১ হাজার ৭৪৭ ভোট পেয়ে মানবাধিকার ও আইন সম্পাদক হন সাখাওয়াত জাকারিয়া। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে এমএম আল মিনহাজ পেয়েছেন ৭ হাজার ৩৮ ভোট। এছাড়া ৯ হাজার ৩৪৪ ভোট পেয়ে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক বিজয় ছিনিয়ে আনেন মাজহারুল ইসলাম।

ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট থেকে সদস্য হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন সাবিকুন্নাহার তামান্না (১০ হাজার ৪৮ ভোট), সর্বমিত্র (৮ হাজার ৯৮৮ ভোট), আনাস ইবনে মুনির (৫ হাজার ১৫ ভোট), ইমরান হোসেন (৬ হাজার ২৫৬), তাজিনুর রহমান (৫ হাজার ৬৯০), মেফতাহুল হোসেন আল মারুফ (৫ হাজার ১৫), বেলাল হোসাইন অপু খান (৪ হাজার ৮৬৫), রাইসুল ইসলাম (৪ হাজার ৫৩৫), মো. শাহিনুর রহমান (৪ হাজার ৩৯০), মোছা. আফসানা আক্তার (৫ হাজার ৭৪৭) ও রায়হান উদ্দীন (৫ হাজার ৮২ ভোট)।

প্যানেলের বাইরে বাকি পাঁচ পদে জয়ী হয়েছেন অন্য প্রার্থীরা। তারা হলেন- সমাজসেবা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবাইর বিন নেছারী। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী সানজিদা আহমেদ তন্বী। সদস্য পদে হেমা চাকমা ও উম্মু উসউয়াতুন রাফিয়া।

এবার ডাকসুতে ২৮টি পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ৪৭১ জন। আর ১৮টি হল সংসদে নির্বাচন হয়েছে ১৩টি পদে। হল সংসদের ২৩৪টি পদের বিপরীতে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৩৫ জন। ডাকসুতে এবার মোট ভোটার ছিলেন ৩৯ হাজার ৮৭৪। এর মধ্যে পাঁচটি ছাত্রী হলে ১৮ হাজার ৯৫৯ আর ১৩টি ছাত্র হলে ভোটার ২০ হাজার ৯১৫ জন ভোটার ছিলেন।

দুই ভিপি প্রার্থীর ফলাফল বর্জন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফলাফল বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম খান ও স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেলের প্রার্থী উমামা ফাতেমা। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানান তারা।  পোস্টে আবিদুল ইসলাম লেখেন, পরিকল্পিত কারচুপির এই ফলাফল দুপুরের পরপরই অনুমান করেছি। নিজেদের মতো করে সংখ্যা বসিয়ে নিন। এই পরিকল্পিত প্রহসন প্রত্যাখ্যান করলাম। উমামা ফাতেমা লেখেন, বয়কট! বয়কট! ডাকসু বর্জন করলাম। সম্পূর্ণ নির্লজ্জ কারচুপির নির্বাচন। ৫ আগস্টের পরে জাতিকে লজ্জা উপহার দিল ঢাবি প্রশাসন। শিবির পালিত প্রশাসন।

শিক্ষার্থীদের রায়কে সম্মান জানালেন জিএস প্রার্থী হামিম

এদিকে ছাত্রদলের প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী শেখ তানভীর বারী হামিম শিক্ষার্থীদের রায়কে সম্মান জানানোর কথা বলেছেন। রাত সোয়া ২টার দিকে নিজের ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি মনে করেন- এটিই তাদের রায়, তবে এই রায়কে আমি সম্মান জানাই। আমি শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। আজকে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চলা এ ভোটানুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়ম দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গণনার ক্ষেত্রে মেশিনের ত্রুটি, জালিয়াতি ও কারচুপি পরিলক্ষিত হয়েছে।

অভিযোগ

এর আগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল এক আনন্দঘন ও গণতান্ত্রিক আবহ। নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। ভোট গ্রহণের সময় কোথাও কোনো ধরনের সংঘাত, বিশৃঙ্খলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। বিকেলের পর থেকেই ক্যাম্পাসে শুরু হয়েছে উত্তেজনা।

ছাত্রদল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, টিএসসি কেন্দ্রে ভোট গণনা দেখানোর এলইডি স্ক্রিনে ব্যালট বাক্স দেখানো হচ্ছে না। তাই তারা ভোট গণনা দেখতে ভেতরে যেতে চান। কিন্তু প্রশাসন তাদের ভেতরে যেতে দিতে বাধা দেয়। স্বতন্ত্র এজিএস প্রার্থী হাসিবুল বলেন, শিবিরের প্রার্থীদের ভোট গণনার সময় ভেতরে যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের সময় বাধা দেওয়া হয়। টিএসসির এলইডি স্ক্রিনে আমরা দীর্ঘ সময় ব্যালট বাক্স দেখছি না। শিবিরকে জেতানোর জন্য ব্যালট বাক্স লুকানো ও কারচুপি করা হচ্ছে।

পরে দীর্ঘ আধাঘণ্টা অবস্থানের পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে প্রশাসন তাদের ভেতরে প্রবেশের জন্য গেট খুলে দেয়। তখন অবস্থানকারীরা তাদের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে চলে যান। পরবর্তীতে মিছিল করেন।

এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছিরউদ্দিনের নেতৃত্বে সংগঠনের একটি প্রতিনিধি দল উপাচার্যের কাছে এসে এই অভিযোগ করে।

ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন বানচালে যারা চেষ্টা করছে তাদের রুখে দিতে হবে। ডাকসু নির্বাচন আমাদের জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার মৌলিক ইস্যু। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সাদিক কায়েম বলেন, আমাদের অবস্থান স্পষ্ট, যারা নির্বাচন বানচাল করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে, তাদের থানায় পাঠাতে হবে। তাদের যারা এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির নির্দেশনা দিয়েছে তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। যারা এ নির্বাচন বানচালের চেষ্টার সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস আজ (গতকাল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের সভাপতি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদপ্রার্থী আবু বাকের মজুমদার।

মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে প্রেস ব্রিফিংয়ে এ অভিযোগ করেন বাকের মজুমদার। তিনি বলেন, ‘মির্জা আব্বাস ডাকসু নির্বাচনের কোনো কিছুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন। কিন্তু তার (মির্জা আব্বাস) আজ (গতকাল) এখানে প্রবেশ করা মানে একটা ভিন্ন বার্তা যাচ্ছে দেশবাসীর কাছে। মির্জা আব্বাসের আজ (গতকাল) ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই, রাইট (অধিকার) নেই। প্রবেশ করেছেন কেন এটা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।’

এদিন সকাল আটটায় ভোটগ্রহণ শুরু করেও সকালের দিকে ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভোটারদের উপস্থিতি। দুপুর ১২টার দিকে প্রতিটি কেন্দ্রে জটলা দেখা দেয়। এ সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের। বিকেল পাঁচটার দিকে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ভোটগ্রহণ শেষ হয়। যদিও ভোটের মাঝে ভোটগ্রহণ বন্ধ হওয়ার খবর আসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পরবর্তীতে ভোটগ্রহণ চলছে এবং কোনো ধরনের গুজবে কান না দিতে প্রার্থী ও ভোটারদের আহ্বান জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। 

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে ভোটগ্রহণের সময় ছিল এক বিশেষ ধরনের শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা। যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় প্রতিটি প্রবেশপথে অবস্থান করছিল। শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে কেন্দ্রে প্রবেশ করছিল। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণবিধি অনুযায়ী ভোটকেন্দ্রের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো প্রচার চালানো নিষিদ্ধ। তাছাড়া ৭ সেপ্টেম্বর থেকেই সব ধরনের প্রচারণা বন্ধ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ভোটকেন্দ্রের সামনে প্রার্থীদের প্রচারে ভোগান্তিতে পড়েন ভোটাররা। লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে প্রার্থীরা কেন্দ্রগুলোর প্রবেশমুখে কৃত্রিম ভিড় তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র, কার্জন হল, উদয়ন স্কুলসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে এ দৃশ্য দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো শিক্ষার্থীদের হাতে লিফলেট ধরিয়ে দিচ্ছেন প্রার্থীরা। এতে কেন্দ্রে সহজে প্রবেশে করতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় বিরক্তবোধ করে প্রতিবাদও জানিয়েছে অনেক ভোটার। 

ঢাবির প্রবেশপথ ও আশপাশে রাজনৈতিক কর্মীদের ভিড়

বিকেল ৪টায় শেষ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। ভোট শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থী ও অনুসারীরা সিনেট ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রবেশমুখ ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি দেখা গেছে। সরেজমিনে কয়েকটি প্রবেশমুখ ঘুরে দেখা যায়, ধীরে ধীরে মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে। গণতন্ত্র ও মুক্তি তোরণের সামনে কয়েকশ’ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ দলবদ্ধভাবে অবস্থান করছেন, কেউবা আশপাশে দাঁড়িয়ে নীরবে অপেক্ষা করছেন।

বকশিবাজার মোড়েও একই চিত্র। এখানে দুইশতাধিক মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। পলাশী মোড়ে তুলনামূলকভাবে ভিড় কম হলেও আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের গতিবিধি ছিল লক্ষণীয়। উপস্থিতি নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা স্বীকার করতে চাননি যে, তারা নিজেদের সমর্থকদের জড়ো করছেন। ফলে ভিড় বাড়লেও এর উৎস ও কারণ সম্পর্কে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলেন না। অবশ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক প্রবেশপথে দায়িত্ব পালন করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ক্যাম্পাসের ভেতরেও আগের তুলনায় পুলিশের উপস্থিতি বেড়েছে।

ঢাবি ভিসির সঙ্গে ছাত্রদলের উচ্চবাচ্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সঙ্গে ছাত্রদল নেতাদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। উপাচার্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জামায়াতি প্রশাসন’ আখ্যা দেয় ছাত্রদল। মঙ্গলবার সিনেট ভবনে ছাত্রদল নেতারা ক্যাম্পাসের আশপাশে জড়ো হওয়া লোকদের ‘জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী’ দাবি করে উপাচার্যকে উপর্যুপরি প্রশ্ন করতে থাকেন। উপাচার্য ‘ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে’ জানালেও তারা তা মানতে রাজি হননি। সেখানে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব উপাচার্যকে বলেন, ‘আমরা আজকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাকে ‘জামায়াতি প্রশাসন’ হিসেবে আখ্যা দিলাম। আমরা আজ থেকে আপনাদের বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করব না। যদি আপনি এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেন তাহলে আমরা আর আপনাকে কোনো সহযোগিতা করব না।’ এ সময় উপাচার্য বলেন, ‘আমি কোনো দলের নই এবং কখনো রাজনীতি করিনি।’

আমি কোনো দলের নই, কখনো রাজনীতি করিনি: ঢাবি ভিসি

নিজে কোনো দলের নন এবং কখনো রাজনীতি করেননি বলে দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান। ছাত্রদল নেতারা উপাচার্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জামায়াতি প্রশাসন’ আখ্যা দেওয়ার পর তিনি এমন দাবি করেন।

মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ছাত্রদল নেতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের প্রতিক্রিয়ায় তিনি এ কথা বলেন। এ দিন বিকেলে সিনেট ভবনে একটি মিটিং চলাকালীন সেখানে ঢুকে পড়েন ছাত্রদল নেতারা। তারা ডাকসু নির্বাচন ঘিরে শিবিরের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের আশপাশে বহিরাগত (জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী) জড়ো করার অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে উপাচার্যের মুখোমুখি হন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এর পর সেখানে কিছুটা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।

ছাত্রদল নেতারা ক্যাম্পাসের আশপাশে জড়ো হওয়া লোকদের ‘জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী’ দাবি করে উপাচার্যকে উপর্যুপরি প্রশ্ন করতে থাকেন। উপাচার্য ‘ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে’ জানালেও তারা তা মানতে রাজি হননি। সেখানে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব উপাচার্যকে বলেন, ‘আমরা আজকের পর আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাকে ‘জামায়াতি প্রশাসন’ হিসেবে আখ্যা দিলাম। আমরা আজ থেকে আপনাদের বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করব না। যদি আপনি এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেন তাহলে আমরা আর আপনাকে কোনো সহযোগিতা করব না।’ এ সময় উপাচার্য বলেন, ‘আমি কোনো দলের নই এবং কখনো রাজনীতি করিনি।’

এমএইচএফ

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।