জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। নির্বাচনে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন’ প্যানেলের প্রার্থী আব্দুর রশিদ জিতু। আর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের মাজহারুল ইসলাম। এজিএস (পুরুষ) পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ফেরদৌস আল হাসান ও এজিএস (নারী) পদে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা নির্বাচিত হয়েছেন।
শনিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ) বিকেলে ফলাফল ঘোষণা করেন জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই ফলাফল ঘোষণা করা হয়। ফলাফল ঘোষণার শুরুতে জাকসু নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও প্রীতিলতা হলের রিটানিং কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুতে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে ফলাফল ঘোষণা শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
ফলাফল ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মনিরুজ্জামান, সদস্য সচিব এ কে এম রাশিদুল আলম, সদস্য লুৎফুল এলাহীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে ভোট গণনা সম্পন্ন হয় বলে নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ।
গত বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শেষে হল কেন্দ্রগুলো থেকে ব্যালট বাক্স সিনেট ভবনে আনা হয় এবং ওইদিন রাত ১০টার কিছু পর থেকে ভোট গণনা শুরু হয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর এখন ফল প্রকাশ করা হয়।
ভিপি পদে আব্দুর রশিদ জিতু ৩৩৩৪ ভোট, জিএস পদে মাজহারুল ইসলাম ৩৯৩০, এজিএস (পুরুষ) পদে ফেরদৌস আল হাসান ২৩৫৮ ও এজিএস (নারী) পদে আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা ৩৪০২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
জানা গেছে, আব্দুর রশিদ জিতু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’ প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক। কোটা সংস্কার আন্দোলনের আগে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও আন্দোলনের সময় সর্বপ্রথম ছাত্রলীগের হাতে মার খেয়ে আহত হন। পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ৫ আগস্ট পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগরের আন্দোলন পরিচালনা করেন তিনি। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পদ থেকে পদত্যাগ করে ‘গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন’ নামে প্ল্যাটফর্মের সূচনা করেন এবং এই প্ল্যাটফর্ম থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন।
ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস ও প্রচার সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী।
নির্বাচনে শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে আবু উবায়দা উসামা (শিবির), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণ সম্পাদক পদে সাফায়েত মীর (শিবির), সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জাহিদুল ইসলাম বাপ্পি (শিবির), সাংস্কৃতিক সম্পাদক শেখ জিসান আহমেদ (স্বতন্ত্র), সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রায়হান উদ্দিন( শিবির), নাট্য সম্পাদক হিসেবে রুহুল ইসলাম (শিবির), ক্রীড়া সম্পাদক পদে মাহমুদুল হাসান কিরণ( স্বতন্ত্র), সহ-ক্রীড়া (ছাত্র) মাহাদী হাসান (শিবির), সহ-ক্রীড়া (ছাত্রী) পদে ফারহানা লুবনা (শিবির), আইটি ও গ্রন্থাগার পদে রাশেদুল ইমন লিখন (শিবির), সমাজসেবা ও মানবসেবা উন্নয়ন সম্পাদক আহসান লাবিব ( বাগছাস), সহ-সমাজসেবা ও মানবসেবা উন্নয়ন পদে তৌহিদ ইসলাম (শিবির), সহ-সমাজসেবা ও মানবসেবা উন্নয়ন (ছাত্রী) পদে নিগার সুলতানা (শিবির), স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক (শিবির) ও পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে তানভীর রহমান (শিবির)।
এছাড়া কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে জয়ী তিনজন হলেন- ফাবলিহা জাহান, নাবিলা বিনতে হারুন, নুসরাত জাহান ইমা। তারা তিনজনই ছাত্রশিবির সমর্থিত। কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে জয়ীরা হলেন- হাফেজ তরিকুল ইসলাম (শিবির), আবু তালহা (শিবির) ও মোহাম্মদ আলী চিশতী ( বাগছাস)।
২১টি হল সংসদের ফল
আলবেরুনী হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন রিফাত আহমেদ শাকিল। জিএস হয়েছেন মোনতাসির বিল্লাহ খান। এজিএস সাদমান হাসান খান।
মওলানা ভাসানী হল সংসদের ভিপি হয়েছেন আবদুল হাই স্বপন, জিএস হয়েছেন হৃদয় পোদ্দার, এজিএস হয়েছেন রাকিব হাসান।
মীর মশাররফ হোসেন হল সংসদের ভিপি হয়েছেন খালেদ জোবায়ের শাবাব, জিএস হয়েছেন শাহরিয়ার নাজিম রিয়াদ, এজিএস হয়েছেন আরাফাত হোসেন।
শহীদ সালাম–বরকত সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন মারুফ হোসেন। জিএস হয়েছেন মাসুদ রানা, এজিএস আবরার আজিম ভুঁইয়া।
আ ফ ম কামাল উদ্দীন হল সংসদের ভিপি হয়েছেন জিএমএম রায়হান কবীর, জিএস আবরার শাহরিয়ার ও এজিএস হয়েছেন রিপন মন্ডল (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা)।
জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম হল সংসদের ভিপি হয়েছেন মো. রাকিবুল ইসলাম। জিএস হয়েছেন আলী আহমদ, এজিএস সামিন ইয়াসির লাবিব।
২১ নম্বর ছাত্র হল সংসদের ভিপি হয়েছেন ইবনে শিহাব, জিএস ওলিউল্লাহ আল মাহদী ও তুষার আহমেদ শাওন।
শহীদ রফিক-জব্বার হল সংসদের ভিপি হয়েছেন মেহেদী হাসান, জিএস হয়েছেন শরীফুল ইসলাম। এজিএস হয়েছেন আরিফুল ইসলাম সাদী।
রোকেয়া হল সংসদের ভিপি হয়েছেন তাসনীম খন্দকার, জিএস নাবিলা মাহজাবীন ও এজিএস ফাহমিদা আক্তার সাওদা।
নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন বুবলী আহমেদ (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা)। জিএস হয়েছে সুমাইয়া খানম (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা), এজিএস প্রার্থী নেই।
১০ নম্বর (ছাত্র) হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন আসিফ মিয়া। জিএস নির্বাচিত হয়েছেন মেহেদী হাসান। এজিএস নির্বাচিত হয়েছেন নাদিম মাহমুদ।
১৫ নম্বর (ছাত্রী) হল সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন শারমীন খাতুন (বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা)। জিএস মেহনাজ মোহনা। এজিএস নির্বাচিত হয়েছেন শাহানা আক্তার।
বেগম সুফিয়া কামাল হল সংসদে প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, সেজন্য নির্বাচন হয়নি। অনেক পদ শূন্য থেকেছে। ভিপি হয়েছেন জান্নাতুন নাঈম জেরিন, জিএস হয়েছেন রুবিনা জাহান তিথি।
বীর প্রতীক তারামন হল সংস্দের ভিপি ফারজানা আক্তার উর্মি, জিএস প্রিয়াঙ্কা কর্মকার প্রিয়া, এজিএস কুদরাতি লাবণ্য।
তবে বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন বয়কট করেছেন ছাত্রদলসহ চারটি প্যানেল ও স্বতন্ত্র পাঁচ প্রার্থী। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা ও নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে একজন নির্বাচন কমিশনারসহ বিএনপিপন্থি চার শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন।
এবারের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় ২৫ পদের বিপরীতে প্রার্থী ১৭৭ জন। মোট ভোটার ১১ হাজার ৮৯৭ জন। এরমধ্যে ছাত্র ছয় হাজার ১১৫ এবং ছাত্রী পাঁচ হাজার ৭২৮ জন। প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পড়েছে।
ছাত্রদের হল ও ভোটার সংখ্যা– আল বেরুনী হল ২১০ জন, আ ফ ম কামালউদ্দিন হল ৩৩৩ জন, মীর মশাররফ হোসেন হল ৪৬৪ জন, শহীদ সালাম-বরকত হল ২৯৮ জন, মওলানা ভাসানী হল ৫১৪ জন, ১০ নম্বর ছাত্র হল ৫২২ জন, শহীদ রফিক-জব্বার হল ৬৫০ জন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল ৩৫০ জন, ২১ নম্বর ছাত্র হল ৭৩৫ জন, জাতীয় কবি নজরুল হল ৯৯২ জন এবং তাজউদ্দীন আহমদ হল ৯৪৭ জন।
ছাত্রীদের হল ও ভোটার সংখ্যা– নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল ২৭৯ জন, জাহানারা ইমাম হল ৩৬৭ জন, প্রীতিলতা হল ৩৯৬ জন, বেগম খালেদা জিয়া হল ৪০৩ জন, সুফিয়া কামাল হল ৪৫৬ জন, ১৩ নম্বর ছাত্রী হল ৫১৯ জন, ১৫ নম্বর ছাত্রী হল ৫৭১ জন, রোকেয়া হল ৯৫৬ জন, ফজিলাতুন্নেছা হল ৭৯৮ জন এবং তারামন বিবি হল ৯৮৩ জন।
জাকসুর ২৫টি পদের বিপরীতে এবার ১৭৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাদের মধ্যে সহ সভাপতি (ভিপি) পদে ৯ জন, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
নির্বাচনে মোট ৮টি প্যানেল অংশ নেয়। এর মধ্যে ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, বামপন্থি সংগঠন ও স্বতন্ত্রদের সমর্থিত প্যানেল ছিল। ছাত্রদের ১১টি ও ছাত্রীদের ১০টি হলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। সব মিলিয়ে ২১টি ভোট কেন্দ্র এবং ২২৪টি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল।
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।