দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
তিনি বলেছেন, “আমরা যা কিছু ফায়ারিং করব, সবই উৎপাদন করব। আমদানি করে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়।”দেশের নিজস্ব চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত উৎপাদিত সমরাস্ত্র বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের সম্প্রসারিত অংশে দেশের দ্বিতীয় সমরাস্ত্র উৎপাদন কারখানা স্থাপনের আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর ও হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সেনাপ্রধান।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, “অস্ত্র উৎপাদন করে শুধু নিজেদের চাহিদা মেটানো নয়, আমরা এটিকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তর করতে চাই। এ শিল্প থেকে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। সেই লক্ষ্যেই জলিল টেক্সটাইল মিলের জায়গাটি নির্বাচন করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় এলাকাটি নিরাপদ। ভবিষ্যতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও এর প্রভাব যাতে বাইরে না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় জায়গাটির কৌশলগত ও লজিস্টিক গুরুত্ব রয়েছে। এ অঞ্চলের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কারখানাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেনাপ্রধান জানান, নতুন কারখানায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ দেশের সব বাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সমরাস্ত্র উৎপাদন করা হবে। নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত উৎপাদিত অস্ত্র ও সমরাস্ত্র বিদেশে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে।
সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “এমন প্রতিরক্ষামুখী প্রশাসন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বহুদিন পায়নি। সরকার দেশের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।”
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি ও স্থাপনা বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি (বিওএফ) সম্প্রসারণ এবং অত্যাধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হবে।
গত ১ জুলাই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে বিটিএমসির মালিকানাধীন এ সম্পত্তি প্রতীকী মূল্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের পাশাপাশি চট্টগ্রামের কৌশলগত অবস্থান ও বন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সমরাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
১৯৬১ সালে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট এলাকায় বেসরকারি উদ্যোগে মেসার্স জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে মিলটি জাতীয়করণ করে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) অধীনে নেওয়া হয়। একসময় বস্ত্র খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও লোকসান ও অব্যবস্থাপনার কারণে পরবর্তীতে এর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র মূল সমরাস্ত্র কারখানা গাজীপুর সেনানিবাসে অবস্থিত। এবার চট্টগ্রামে জলিল টেক্সটাইল মিলের জমি ও স্থাপনায় বিওএফ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ সামরিক অস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং বিটিএমসির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান বক্তব্য দেন।
চুক্তিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের পক্ষে বিটিএমসির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষে মিলিটারি এস্টেট অফিসার মিসেস সাজিয়ে তাহের স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আরএইচ