দক্ষিণ পূর্ব

ক্ষমতায় ফিরে বিএনপিতে নতুন সমীকরণ, তৃণমূলে বাড়ছে অস্বস্তি

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পঠিত : ৪৭
ক্ষমতায় ফিরে বিএনপিতে নতুন সমীকরণ, তৃণমূলে বাড়ছে অস্বস্তি

ফাইল ছবি

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন 

প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতেগড়া দলটির নেতৃত্ব এখন তার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের হাতে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সাফল্যের পর মাঠের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ফিরেছিল উচ্ছ্বাস। কিন্তু সরকার গঠনের পর গত ছয় মাসে সেই সুসময়ের মধ্যেই দলের ভেতরে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট।

আন্দোলনে সক্রিয় নেতাদের অনেকে এখন সরকারের অংশ। কেউ মন্ত্রিসভায়, কেউ সংসদে, কেউবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, তারা তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না। আবার অনেকে নিজের আখের গোছাতে সাংগঠনিক কর্মসূচির বদলে সচিবালয়, সংসদ ও প্রশাসনের নানা জায়গায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। ফলে দল ও সংগঠন একরকম স্থবির হয়ে পড়েছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল—সবখানেই এখন চলছে নতুন হিসাবনিকাশ।

তৃণমূলে কোন্দল, মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন:

বাড়ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। তৃণমূলে আধিপত্যের লড়াইয়ে ঘটছে খুনোখুনি। কোথাও কোথাও দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় নিজেরা নিজেরাই বিবাদে জড়াচ্ছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, রাজপথের ত্যাগী নেতাদের দল এখন মূল্যায়ন করছে না। এখন সুবিধাভোগীরা দলে ভিড়ছে। 

নেতারা সরকার পরিচালনার ব্যস্ততায় দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়েছে। ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়ের বিএনপি আর ক্ষমতায় আসার পরের বিএনপির মধ্যে তৈরি হয়েছে দৃশ্যমান পার্থক্য। নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও আগের মতো নেতাকর্মীদের সেই জমজমাট উপস্থিতি নেই। তবে রুহুল কবির রিজভী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ফের কার্যালয়মুখী হচ্ছেন নেতাকর্মীরা।

বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র ও তৃণমূলের নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, সরকার গঠনের পর দলের সামনে একদিকে যেমন এসেছে নিজেদের রাজনৈতিক সাফল্যকে স্থায়ী করার সুযোগ, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে চাপ। কারণ ক্ষমতার সঙ্গে বেড়েছে প্রত্যাশাও। পদ-পদবি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার, নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ—এসব মিলে দলের ভেতরে তৈরি হচ্ছে নানা সমীকরণ। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের নেতাদের সঙ্গে নতুন করে সামনে আসা নেতৃত্বের দূরত্ব ও টানাপড়েন তৈরি হয়েছে।

তবে দলের সিনিয়র নেতারা এসব সংকটের কথা স্বীকার করতে চাইছেন না। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি এখন সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করার কাজেই মনোযোগী।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী রূপেই বিদ্যমান আছে। আমরা বিভিন্ন সভা ও পাবলিক মিটিংয়ে সেটা দেখতে পেয়েছি। রাজনৈতিক যে দলটা এখন ক্ষমতায় আছে, তৃণমূলের কর্মী থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও সরকারের অংশ। তাহলে সরকার ভালো কাজ করলে, গঠনমূলক কাজ করলে জনগণের মধ্যে প্রশংসা হবে। তখনই দলের ইমেজ বৃদ্ধি হবে।

নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে দল:

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানোত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য ধরে রাখাই এখন মুখ্য চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি সংসদে সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন দলটিকে দ্বিধায় ফেলেছে।

জিয়া থেকে তারেক, নেতৃত্বের হস্তান্তর:

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরবর্তী নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসেন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিপথগামী সেনাসদস্যদের হাতে শহীদ হওয়ার আগ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন।

প্রতিষ্ঠার পর নানা ঘাত-প্রতিঘাত সইতে হয়েছে বিএনপিকে। ১৯৮৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিএনপির হাল ধরেন তারই সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া। এরপর বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ়চেতা, আপসহীন ও সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বে বিএনপি এগিয়েছে দুর্দান্ত গতিতে। দোর্দণ্ড প্রতাপশালী স্বৈরশাসক মরহুম এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এক দশকের মাথায় ১৯৯১ সালে বিপুল সমর্থন নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল বিএনপি। এরপর ১৯৬ ও ২০০১ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

গত ৪২ বছর বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর প্রায় ৭ বছর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পদবি নিয়ে তারেক রহমান মূলত দল চালিয়ে আসছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ ডিসেম্বর মারা যান। মায়ের মৃত্যুর পর চার দশকের বেশি সময় পর নতুন চেয়ারম্যান পায় বিএনপি। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত এ দলের হাল ধরেছেন তারই বড় ছেলে তারেক রহমান।

ক্ষমতার সুসময়ে দাঁড়িয়ে বিএনপি এখন দুই পথের মুখে। একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়, অন্যদিকে দলের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষা। তৃণমূলের প্রশ্ন—এই সুসময় কি শুধুই ক্ষমতার, নাকি সংগঠনেরও?

দক্ষিণপূর্ব 

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।