মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন:
দেশের অন্যতম বৃহৎ কাঁচা চামড়ার বাজার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম। একসময় এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম নগরীতে গড়ে উঠেছিল ২২টি ট্যানারি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে প্রায় সব ট্যানারিই বন্ধ হয়ে গেছে; বর্তমানে চালু রয়েছে শুধুমাত্র একটি ট্যানারি। ফলে কোরবানির মৌসুম এলেই চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। এবারও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে বিপুল পরিমাণ কোরবানির পশুর চামড়া সড়কে ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
ঈদুল আজহার পর শুক্রবার ও শনিবার নগরীর আতুরার ডিপো, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট ও চৌমুহনী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে স্তূপ হয়ে পড়ে আছে শত শত গরুর চামড়া। অধিকাংশ চামড়ায় লবণ দেওয়া হয়নি। ফলে দ্রুত পচন ধরেছে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ। জনস্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে পরে এসব চামড়া অপসারণ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। আড়তদারদের একটি অংশ সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম অস্বাভাবিকভাবে কমিয়ে দেয়ায় তারা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
হাটহাজারি থেকে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ী এনামুল হক জানান, তিনি প্রায় ২৩০টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। প্রতিটির পেছনে গড়ে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হলেও আড়তদাররা ৫০ থেকে ১০০ টাকার বেশি দাম দিতে রাজি হননি।
ফটিকছড়ি থেকে আসা নুরুল আলম বলেন, “প্রতিটি বড় গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় সংগ্রহ করেছি। অথচ আড়তে সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা দাম বলা হয়েছে। লোকসান গুনে বিক্রি করার চেয়ে অনেকেই চামড়া ফেলে চলে গেছেন।”
হালিশহরের ব্যবসায়ী নুরুচ্ছফা জানান, ২০০টি চামড়া সংগ্রহ করতে তার গড়ে ৪০০ টাকা করে খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে কেউ ১৫০ টাকার বেশি দাম বলেনি। সারা রাত অপেক্ষা করেও বিক্রি করতে না পেরে তিনি চামড়া ফেলে চলে যান।
মুরাদপুরে চামড়া নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রহিম মিয়া বলেন, “৬০০টির বেশি চামড়া সংগ্রহ করেছিলাম। রাতভর চেষ্টা করে মাত্র ২৫৫টি চামড়া ১০০ টাকা করে বিক্রি করেছি। বাকিগুলোর কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি।”
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ১১৫ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৯৯ কোটি ডলারের পণ্য। সরকারের লক্ষ্য এই খাতকে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত করা।
চলতি বছর সরকার ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত গরু ও মহিষের চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ এক হাজার পাঁচ টন লবণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার তাদের ৪০ জনের মতো আড়তদার চামড়া কিনেছেন। চট্টগ্রাম জেলায় প্রায় ৪ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা আবু তাহের সিদ্দিকী জানান, ঈদের দিন থেকে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পচনধরা বিপুল পরিমাণ চামড়া অপসারণ করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি ডাম্প ট্রাক ও ময়লাবাহী ভ্যানে করে চামড়াগুলো ভাগাড়ে নেওয়া হয়েছে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মোসলেম উদ্দীন বলেন, ‘ট্যানারি মালিকেরা আমাদের কাছ থেকেও দামে নেয় না। তারা ৩০ টাকা, ৩৫ টাকা, ৪০ টাকা ফুটের মধ্যে চামড়া নেয়। ফটের মধ্য থেকে নেয়ার কারণে আমরা লোকসানে পড়ে যাই। চামড়া নষ্ট হওয়ার আরেকটি বড় কারণ পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। সরকারি উদ্যোগে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে জাতীয় এ সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব।
দক্ষিণপূর্ব/
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।