দক্ষিণ পূর্ব

নভেম্বরের মধ্যে চালু হতে পারে বন্ধ তিন সার কারখানা

দক্ষিণপূর্ব
দক্ষিণপূর্ব
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:২১ সকাল
পঠিত : ৩৭
নভেম্বরের মধ্যে চালু হতে পারে বন্ধ তিন সার কারখানা

ছবি

Degchibarictg

দেশে সার উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বন্ধ থাকা তিনটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানা আগামী নভেম্বরের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়ন ও নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বছরে ২৭ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির অধীন সাতটি সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটি চালু রয়েছে। গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ ও কাঁচামালের সংকটে বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড (টিএসপিএল), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)।

কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মেরামতকাজ সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি চলছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন শুরু করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্ধারিত চাপে গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় চলছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কাঁচামাল পাওয়া গেলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে কারখানাগুলো চালু করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদার পুরোটা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে।

বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলোতে ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া, ৬৮ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন ডিএপি সার উৎপাদিত হয়েছে।

ওই অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন দিয়ে এ চাহিদার প্রায় ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি সারের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের অবদান ছিল যথাক্রমে প্রায় ৯ দশমিক ১০ ও ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

এ পরিস্থিতিতে বন্ধ টিএসপি ও ডিএপি কারখানা চালু করা গেলে ফসফেটজাত সারের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ নির্ভর করবে কাঁচামালের প্রাপ্যতা, কারখানার প্রকৃত সক্ষমতা এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করার ওপর।

বিসিআইসি চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪৪ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৯ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানি করতে হয়েছে। দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানির ব্যয় কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং কৃষকদের কাছে সময়মতো সার পৌঁছানো সহজ হবে।

তিনি জানান, দেশের সব সার কারখানা চালু করে ইউরিয়া সার আমদানিতে ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।

বিসিআইসি সূত্র জানায়, আশুগঞ্জ সার কারখানায় উৎপাদন পুনরায় শুরু করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট গ্যাস সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। নির্ধারিত চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাওয়া গেলে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে, ফসফরিক অ্যাসিডের ঘাটতি ও সালফিউরিক অ্যাসিড প্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় টিএসপি কমপ্লেক্সের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ ও প্ল্যান্টের মেরামতকাজ শেষ হলে কারখানাটি চালু করা যাবে। ফসফরিক অ্যাসিডের স্বল্পতার কারণে ডিএপি কারখানার উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে।

নভেম্বরের মধ্যে টিএসপি ও ডিএপি কারখানায় উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিসিআইসি। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে কাঁচামাল সংগ্রহ, যন্ত্রপাতি মেরামত এবং কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করা জরুরি।

ইউরিয়া সার উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল প্রাকৃতিক গ্যাস। পর্যাপ্ত গ্যাস ও নির্ধারিত চাপ না থাকলে এ ধরনের কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখা কঠিন। অন্যদিকে, টিএসপি ও ডিএপি উৎপাদনে ফসফরিক অ্যাসিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক কাঁচামালের প্রয়োজন হয়।

এ কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) এবং সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করছে বিসিআইসি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু বন্ধ কারখানা চালু করাই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল সরবরাহের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।

বন্ধ কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বিসিআইসির। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করতে চায় সংস্থাটি।

এ লক্ষ্য অর্জনে পুরোনো প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, উৎপাদন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন ইউরিয়া ও টিএসপি সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বিসিআইসি চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা বলেন, দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বিদ্যমান কারখানার আধুনিকায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহ এবং কারখানাগুলোর কার্যকর পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।

দেশীয় সার উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ আরও স্থিতিশীল হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া কিংবা আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে স্থানীয় উৎপাদন দেশের কৃষি খাতের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করবে।

একই সঙ্গে সার আমদানিতে ব্যয় কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। তবে এ উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিমাণ, কারখানার পরিচালন ব্যয় এবং দেশীয় উৎপাদনের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর।

সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের সার উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলোর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। এ জন্য বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও কাঁচামাল সরবরাহ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদনব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিসিআইসি।

সূত্র বাসস

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।