চট্টগ্রামের আনোয়ারায় পারকি সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন কর্ণফুলী নদী থেকে অভিনব কৌশলে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নদীতে ড্রেজার ও বাল্কহেড বসিয়ে এবং উপকূলে দুটি বুস্টার মেশিন স্থাপন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে তোলা হচ্ছে বালু। পরে এসব বালু ব্যবহার করা হচ্ছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটে। এতে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের মোহনা, পর্যটনকেন্দ্র পারকি সৈকত এবং ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়ার নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে পারকি সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়া এলাকায় গিয়ে বালু উত্তোলনের এমন চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে এভাবে দিনরাত বালু তোলা হচ্ছে। ঢাকার প্রিমিয়ার নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের কাজটি করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পারকি সৈকতসংলগ্ন কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছে। এরপর ঝাউবাগানের ভেতর দিয়ে বসানো পাইপলাইনে সেই বালু নেওয়া হচ্ছে উপকূলের একটি নির্দিষ্ট স্থানে। সেখানে বাল্কহেডে জমা করে প্রায় এক কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমিতে। উপকূলে বসানো হয়েছে দুটি বুস্টার মেশিন। সাগরে দুটি বাল্কহেড ও একটি ড্রেজারও দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে কর্ণফুলী নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এতে পারকি সৈকত, ঝাউবাগান ও টানেল সার্ভিস এরিয়া ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিমিয়ার নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় বারশত ইউনিয়নের কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি ভরাটের কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির সুপারভাইজার সাইফুল ইসলামসহ ১০ থেকে ১৫ জন কর্মী সেখানে কাজ তদারকি করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উপকূলীয় এলাকা রক্ষায় ১৯৯৩-৯৪ ও ২০০২ সালে পর্যায়ক্রমে পারকি ও আশপাশের প্রায় ৮০ হেক্টর এলাকায় ঝাউগাছ রোপণ করে বন বিভাগ। সময়ের সঙ্গে এসব গাছ বড় হয়ে এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের কাছে এটি ঝাউবাগান নামেও পরিচিত।
সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পারকি থেকে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে সৈকত ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল সার্ভিস এরিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় এর প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। এ বিষয়ে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তাঁরা।
এদিকে বালু পরিবহনের জন্য সৈকতের ওপর দিয়ে নেওয়া পাইপলাইন দিয়ে বালুর সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছও উঠে আসছে। পরে স্থানীয় কয়েকজনকে জাল ও হাত দিয়ে সেসব মাছ সংগ্রহ করতে দেখা যায়।
পারকি এলাকায় ঝাউগাছের পাশে স্থাপন করা একটি হলুদ রঙের সাইনবোর্ডে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি, এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং চায়না ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএনটিআইসি) নাম ও লোগো রয়েছে। তবে সরেজমিনে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রকল্পে তাদের সংশ্লিষ্টতা এবং বালু উত্তোলনের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল। প্রথম দিকে এলাকাবাসী বাধা দিলেও পরে আর কেউ প্রতিবাদ করছেন না। তাঁদের প্রশ্ন, এত বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব কে মূল্যায়ন করবে? এ ছাড়া বালু উত্তোলনের কাজ প্রিমিয়ার কোম্পানি করলেও প্রকল্পের সাইনবোর্ডে প্রতিষ্ঠানটির নাম নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েও তাঁদের মধ্যে অস্পষ্টতা রয়েছে।
এ বিষয়ে প্রিমিয়ার কোম্পানির সুপারভাইজার সাইফুল ইসলাম বলেন, তাঁরা শুধু জমি ভরাটের কাজ করছেন। প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান চুক্তিভিত্তিক তাঁদের কাছ থেকে বাল্কহেড, ড্রেজার ও দুটি বুস্টার মেশিন ভাড়া নিয়েছে। তবে বালু কোথা থেকে তোলা হচ্ছে কিংবা উত্তোলনের অনুমতি রয়েছে কি না, তা তাঁরা জানেন না।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কর্ণফুলী নদীর নির্দিষ্ট স্থান থেকে বালু উত্তোলন করে বাল্কহেডে এনে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমিতে খালাস করা হচ্ছে। তবে সাগরে অবস্থান করা বাল্কহেড ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন সম্ভব নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আবু জাফর মজুমদার বলেন, পারকি সৈকত সংলগ্ন নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। কারা বালু উত্তোলন করছে, তা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরএইচ
মন্তব্য (০)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।