দক্ষিণ পূর্ব

‘Death like autumn leaves’—শরতের ঝরা পাতার মতোই ঝরে গেল মাইশার জীবন

মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন
প্রকাশ : ৩ নভেম্বর ২০২৬ ০৫:৪৬ বিকাল
পঠিত : ৩৩
‘Death like autumn leaves’—শরতের ঝরা পাতার মতোই ঝরে গেল মাইশার জীবন

ছবি

Degchibarictg

‘Death like autumn leaves’—শরতের ঝরা পাতার মতো মৃত্যু। কথাটি লেখা ছিল আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কভারে। কে জানত, একদিন এই লেখাটিই তাঁর মৃত্যুর পর এমনভাবে আলোচনায় আসবে! জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে চলতে থাকা ২২ বছরের তরুণীটি সত্যিই যেন ঝরে গেলেন শরতের পাতার মতোই। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে গেল তাঁর সব স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও পথচলা।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঘটে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি। একটি দ্রুতগতির কনটেইনারবাহী লরির ধাক্কায় ৮ নম্বর রুটের একটি মিনিবাস উল্টে যায়। বাসটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান মাইশা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

মাইশার মৃত্যুর পর তাঁর মোবাইল ফোনের কভারের লেখাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ‘Death like autumn leaves’—মাত্র চারটি শব্দের এই বাক্য যেন নতুন করে নাড়া দিয়েছে সহপাঠী ও পরিচিতজনদের। অনেকেই লেখাটির সঙ্গে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর অদ্ভুত মিল খুঁজে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কারও কাছে এটি কেবল একটি বাক্য, আবার কারও কাছে এখন তা হারিয়ে যাওয়া একটি জীবনের বেদনাদায়ক স্মারক।

তবে মাইশার মৃত্যুর সবচেয়ে ভারী আঘাত নেমে এসেছে তাঁর পরিবারের ওপর। কয়েক দিন আগেও যে বাড়িতে মেয়ের জন্মদিন ঘিরে ছিল আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সেই বাড়িতেই এখন শোকের মাতম।

মাইশার বাবা দিদারুল আলমের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে মেয়ের জন্মদিনের স্মৃতি। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মেয়ের ২২তম জন্মদিন পালন করেছিলেন তাঁরা। আত্মীয়স্বজনকে দাওয়াত করে বাড়িতে আয়োজন করেছিলেন আনন্দের। মেয়ের খুশিতে খুশি হয়েছিলেন পরিবারের সবাই। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই মেয়ের মরদেহ দেখতে হবে, তা কল্পনাও করেননি তিনি।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে মেয়েকে হারানোর শোক নিয়ে দিদারুল আলম বলেন, ‘আমার একটা মেয়ে ছিল। ২২ বছর বয়স হয়েছিল। আমি মেয়েকে হারানোর শোক মেনে নিতে পারছি না। গত শুক্রবার তার জন্মদিন পালন করেছি। আত্মীয়স্বজন সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিলাম। আমার মেয়ে কত খুশি ছিল। এখন সব শেষ।’

তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল দিদারুল আলমের সংসার। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে তিনি বারবার বলছিলেন, তাঁর আর কোনো মেয়ে নেই। সকালে মাইশা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে এসে জানতে পারেন, মেয়ে আর বেঁচে নেই।

মাইশার মা সালমা আক্তারের কাছেও মেয়ের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দুর্ঘটনার দিন সকালে মেয়ের সঙ্গে মাত্র দুই মিনিট কথা হয়েছিল তাঁর। মাইশার মাথাব্যথা ছিল। কিছুক্ষণ পর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের ফোনে জানতে পারেন, মেয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। হাসপাতালে এসে আর মেয়েকে জীবিত পাননি।

মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল সালমা আক্তারের। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশা ছিল পরিবারের। তিনি জানান, মাইশা পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। বড় হওয়ার, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই থেমে গেল তাঁর জীবন।

এদিকে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাবা দিদারুল আলম। মহাসড়কে কনটেইনারবাহী লরির বেপরোয়া চলাচল নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দিনের বেলায় এসব ভারী যানবাহন যেভাবে চলাচল করছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না কেন? বারবার দুর্ঘটনায় মানুষের প্রাণ গেলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতো আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়, সেই আকুতি জানিয়েছেন তিনি।

দুর্ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুটি লরি প্রতিযোগিতা করে চলছিল। এ সময় একটি লরি মহাসড়কে দাঁড়িয়ে থাকা মিনিবাসটিকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কায় বাসটি কাত হয়ে উল্টে যায়। দুর্ঘটনায় মাইশা ছাড়াও আরও কয়েকজন আহত হন। তাঁদের মধ্যে এক শিক্ষার্থীর অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মোস্তফা মুনির চৌধুরী।

বার আউলিয়া হাইওয়ে থানার সার্জেন্ট শফিউল ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক এলাকায় মিনিবাস থেকে নেমেছিলেন মাইশা। এর কিছুক্ষণ পরই বাসটি তাঁর ওপর উল্টে পড়ে। স্থানীয় লোকজন লরি দুটি আটক করেন। পরে পুলিশ লরি ও মিনিবাসটি থানায় নিয়ে যায়।

মাইশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও পাশের রেলপথ অবরোধ করেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের বিচার, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ, অবৈধ পার্কিং বন্ধসহ আট দফা দাবি জানান তাঁরা।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় বারবার দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়। একই সঙ্গে সীতাকুণ্ড ও ফৌজদারহাট স্টেশনে আটকা পড়ে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকা আরেকটি ট্রেনের যাত্রাও বিলম্বিত হয়। এতে সড়ক ও রেলপথের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। পরে বিকেল সোয়া চারটার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর মহাসড়ক ও রেলপথে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

মাগরিবের নামাজের পর জানাজা শেষে  মিরসরাই উপজেলার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। 

আরএইচ 

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।