দক্ষিণ পূর্ব

চট্টগ্রামে নিত্যপণ্যের দাম বেসামাল

নিত্যপণ্যের বাজারে লেগেছে জ্বালানি তেলের ধাক্কা

Jalal Rumi
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫৯ দুপুর
সর্বশেষ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে
পঠিত : ৩৪

নিজস্ব প্রতিবেদক 

আন্তর্জাতিক বাজারে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম কমলেও চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। গত দেড় মাসে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম মণপ্রতি বেড়েছে প্রায় ৩০০ টাকা। শুধু তেল নয়, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারেও। এর সঙ্গে বৃষ্টি ও সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজি, মাছ, ডিম ও মাংসের দামও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।


বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি প্রাইস ডেটা বা ‘পিংক শিট’-এর আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, জুন-আগস্ট তিন মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের গড় দাম এপ্রিল-জুনের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে সয়াবিন তেলের গড় দাম কমেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ।


বিশ্বব্যাংকের ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য বলছে, এপ্রিল-জুন সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পাম তেলের গড় দাম ছিল টনপ্রতি ১ হাজার ১২৮ দশমিক ৬৭ ডলার। জুন-আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০৭ দশমিক ৩৩ ডলারে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে গড় দাম কমেছে ২১ দশমিক ৩৪ ডলার।

সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারে একই প্রবণতা দেখা গেছে। এপ্রিল-জুনে টনপ্রতি গড় দাম ছিল ১ হাজার ৭২১ দশমিক ৩৩ ডলার। জুন-আগস্টে তা নেমে আসে ১ হাজার ৬৭৮ দশমিক ৬৭ ডলারে। অর্থাৎ গড় দাম কমেছে ৪২ দশমিক ৬৭ ডলার।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, দেড় মাস আগে সয়াবিন তেল প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ২০০ টাকায়। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ টাকায়। পাম তেলের দামও মণপ্রতি প্রায় ৩০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৬০০ টাকা। আর সুপার পাম তেল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬ হাজার ৮০০ টাকা মণ।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী শাহজালাল বলেন, বাজারে তেলের সরবরাহ তুলনামূলক কম। ডিলাররা সরবরাহ করলেও চাহিদার তুলনায় তা কম থাকায় দাম বেড়েছে।

খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ২০৮ থেকে ২১০ টাকা, পাম তেল ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা এবং সুপার পাম তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেই দেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দাম কমে না। আমদানির সময়কার মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া, বন্দর ও পরিবহন ব্যয়, শুল্ক-কর, ব্যাংকিং খরচ, পরিশোধন ও প্যাকেজিং ব্যয়সহ বিভিন্ন উপাদান স্থানীয় বাজারের দামে প্রভাব ফেলে।

চলতি বছর সরকার দুই দফায় সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় করেছে। ২৯ এপ্রিল এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৯৭৫ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল ১৭৬ থেকে বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করা হয়।

এরপর ২ সেপ্টেম্বর এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য আরও ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পাঁচ লিটারের বোতলের দাম করা হয় ১ হাজার টাকা।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এইচএস কোডে মোট ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল ৫০ হাজার ৮৯৬ টন এবং সয়াবিন তেল ১৫ হাজার ৬১ টন।

মোট আমদানির মধ্যে পাম তেলের অংশ প্রায় ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং সয়াবিন তেলের অংশ ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ওই সময়ে সয়াবিন তেলের তুলনায় পাম তেল আমদানি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৪ গুণ বেশি।

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ১০২ টাকা, পেঁয়াজ ৪০ টাকা, আদা ৯৫ টাকা, রসুন ১২২ টাকা এবং ভারতীয় লাল মরিচ ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারতীয় মিষ্টি মরিচের দাম ৪৪০ টাকা। দেশি মরিচ মানভেদে ২৮০ থেকে ৩১০ টাকা এবং হাটহাজারীর মিষ্টি মরিচ ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া মোটা মসুর ডাল ৮০ টাকা, মুগ ডাল ১৫০ টাকা, মটর ডাল ৫৪ টাকা এবং সাদা মটর ৫৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ান ছোলা ৯৫ টাকা এবং ভারতীয় ছোলা ৯৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক আলা উদ্দীন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের পাইকারি দামের তুলনা করতে শুধু টনপ্রতি মূল্য দেখলে হবে না। আমদানি থেকে খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত পুরো ব্যয় কাঠামো বিবেচনায় নিতে হবে। সরবরাহ পরিস্থিতি ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনও বাজারদরে প্রভাব ফেলে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী জুলাই থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার ৯৫৬ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পাম তেল প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং সয়াবিন তেল প্রায় ২৩ শতাংশ। তবে বাজারদর সরবরাহ ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন উপাদানের ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশে ভোজ্যতেলের মোট চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি আমদানি, পরিবহন ও সরবরাহ পরিস্থিতির পরিবর্তনও দেশের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।


ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্প্রতি ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের খরচও বেড়েছে। তাদের মতে, একবারে লিটারে ২০ টাকা না বাড়িয়ে দুই-তিন ধাপে ডিজেলের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তুলনামূলক কম পড়ত।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, আগে যে ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানের ভাড়া ছিল প্রায় ২৫ হাজার টাকা, এখন একই পরিবহনে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে। ফলে পণ্য পরিবহনের বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

শুক্রবার নগরীর কাজীর দেউড়ি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় এ সপ্তাহে বেশির ভাগ সবজির দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আগাম শীতকালীন সবজির দাম রয়েছে আরও বেশি।

বাজারে ঢেঁড়স ৮০ টাকা, শিম ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, কাকরোল ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং পেঁপে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দাম ১১০ থেকে ১২০ টাকা, বাঁধাকপি ১০০ টাকা, লাউ ৫০ টাকা এবং পটল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি।

আগাম শীতকালীন সবজির মধ্যে ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা কেজি দরে। শিমের দাম উঠেছে ২০০ টাকা কেজিতে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব শীতকালীন সবজি এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে আসেনি।

ডিমের দামও গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। বর্তমানে বাদামি ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়, যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা বেশি। সাদা ডিম পাওয়া যাচ্ছে ১৪৫ টাকা ডজন।

ছাগলের মাংসের দামও কেজিতে প্রায় ৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ছাগলের মাংস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২৫০ টাকা কেজি দরে।

এদিকে চট্টগ্রামের বাজারে মাছের সরবরাহও কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে মিঠাপানি ও সামুদ্রিক—দুই ধরনের মাছের সরবরাহ কম থাকায় দামও ঊর্ধ্বমুখী।

ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, সামনে রমজান থাকায় এখন থেকেই বাজার পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

বিক্রেতাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার ফসলের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ফলে এর প্রভাব পড়েছে সবজিসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু বক্কর বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের বাজারে প্রভাব পড়বে। খাতুনগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহন করা হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় সড়ক পরিবহনের পাশাপাশি লাইটার জাহাজের ভাড়াও বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হবে।


কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সামনে রমজান। এখন থেকেই দাম বৃদ্ধির কোনো অজুহাত তৈরি হচ্ছে কি না, সেটি নজরদারিতে রাখা দরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফল ভোক্তারা কতটা পাচ্ছেন, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির কারণও নজরদারির আওতায় আনা উচিত।

মন্তব্য (০)

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।
সর্বোচ্চ ১০০০ অক্ষর।

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।